রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী সাদি মহম্মদ কানাডার টরন্টোতে এসেছিলেন গান গাইতে। আমি তখন স্থানীয় সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারের সম্পাদক। সেই সূত্রে ডেনফোর্থের অফিসের সামনেই ৯ ডজে অনুষ্ঠিত বাঙালিদের নানা অনুষ্ঠানে যেতে হতো। আবার আমার অফিসে এসেও দেশের খ্যাতিমানরা আড্ডা দিতেন। জিয়া হায়দার, হায়াৎ মাহমুদ, কবরীরা নিয়মিত আসতেন। সেই তালিকায় যুক্ত হলেন সাদি মহম্মদ।
একবার আড্ডা দিতে দিতে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে আমার লেখা গানের কথা। সুজেয় শ্যামের ম্যালোডি সুরে একটি ভোরের গান ‘নিশিরাতে তুমি এসেছিলে/ স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে’। গানটি সাদি ভাই দরদ দিয়ে গেয়েছিলেন।
সাদি ভাই শুধু বিশ্বভারতী থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীই ছিলেন না; আধুনিক গান গাইতেন, সুর করতেন। ২০০৭ সালে তার সুর করা ‘আমাকে খুঁজে পাবে ভোরের শিশিরে’ প্রথম অ্যালবাম বের হয়। এখন তাকে খুঁজতে হবে ভোরের শিশিরে কিংবা কুয়াশায়।
যাহোক, তিনি টেকনিক্যাল কারণে আমার গানটি ওই অ্যালবামে নিতে পারেন নি। কারণ, সেই গানের সুরকার ছিলেন সুজেয় দা।
সেদিন বাংলা রিপোর্টারের অফিসের দ্বিপাক্ষিক আড্ডা থেকে জেনেছিলাম, ঢাকার মোহাম্মদপুরের সলিমউল্লাহ রোডের নামকরণ করা হয়েছিল তার শহীদ বাবা সলিমউল্লাহর নামে। যুদ্ধোত্তর দেশে তার মা তখন কাঁথা সেলাই করে সাদি-শিবলীকে নিয়ে সংসার চালাতেন। তবু মায়ের স্বপ্নপূরণ না করে অর্থাৎ বুয়েটে ভর্তি হয়েও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়েন নি।
আরো একটি বিষয় জেনে অবাক হয়েছিলাম, শিল্পীবন্ধু মাকসুদুল হক ২০০৫ সালে বিটিভিতে স্বরচিত সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের প্রেক্ষিতে মাকসুদ-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। আমি ছিলাম, মাকসুদের পক্ষে। আমরা ‘রবীন্দ্ররাজাকার’ নামে লিফলেট করেছিলাম। সেজন্য ওয়াহিদুল হক ভাই খুব ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তখন সাদি ভাই ছিলেন ওয়াহিদুল হকের পক্ষে।
তবু সাদি ভাই আমাকে ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। ২০২১ সালে দেশে গেলাম। কাজল ঘোষ ডাকলো চ্যানেল আইয়ের ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে। সরাসরি প্রচারিত অনুষ্ঠানে আমি আর সাইফুল আলম আলোচনা করছি।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন স্টুডিওতে এসে জানালেন, বাইরে আমার জন্য সাদি মহম্মদ অপেক্ষা করছেন। কাছে যেতেই জড়িয়ে নিলেন।
সাদি ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে আমার একটি কবিতার কথা। কবিতায় একটি লোক আত্মহত্যা করতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে পড়ে বারান্দার পোষা পাখির কথা, মনে পড়ে টবের ফুলগাছের কথা। পাখিটিকে খাবার দেওয়া হয়নি, ফুলগাছে জল দেওয়া হয়নি!
পাখির জন্য, ফুলগাছের জন্য লোকটি আত্মহত্যা না করে ফিরে আসে। ফুল-পাাখির জন্য তার আর আত্মহত্যা করা হয় না।
সাদি ভাই, আপনারও উচিৎ ছিল, ফুল-পাখিদের জন্য ফিরে আসা! সঙ্গীতের জন্য বেঁচে থাকা।

