মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

রাশিয়ার তীব্র হামলায় ইউক্রেনের দুর্বলতাগুলো উঠে আসছে

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০৫:৩০

মে মাস ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। রুশ সেনারা ইউক্রেনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে! উত্তর খারকিভ অঞ্চলের ভোভচানস্ক শহরে গত শুক্রবার তীব্র গোলাবর্ষণ ও বিমান বোমা হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। অথচ দেড় বছরেরও বেশি আগে রাশিয়ার দখল থেকে এই অঞ্চল মুক্ত করেছিল ইউক্রেন। খারকিভ হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত সাত জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে অনেকে। খারকিভ অঞ্চলে নতুন করে হামলার ঘটনায় স্পষ্ট বোঝা যায়, ব্যাপক শক্তিমত্তা নিয়ে মাঠে নেমেছে মস্কো।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্রসরঞ্জাম পাওয়ার কথা রয়েছে কিয়েভের। ঠিক এমন একটি অবস্থায় ইউক্রেনের দুর্বলতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এখন পর্যন্ত মোটাদাগে ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্ব অঞ্চলেই সামরিক তত্পরতা চালিয়ে আসছিল মস্কো। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবার নতুন নতুন অঞ্চলে হামলা চালানোর কথা ভাবছে রুশ বাহিনী।

এই বছর ইউক্রেনে আন্তঃসীমান্ত হামলা বেড়েছে। ফলে আন্তঃসীমান্তনিরাপত্তা ইউক্রেনকে বেশ ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় বাহিনীকে একঅর্থে বিক্ষিপ্তভাবে লড়াই করতে দেখা যাচ্ছে। রুশ বাহিনীর তুলনায় ইউক্রেনীয় সেনাদের হাতে সেভাবে আর্টিলারিও নেই। বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব কিছু ছাপিয়ে ইউক্রেনের জন্য মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সেনাঘাটতি’। ইউক্রেনের জন্য চিন্তার আরো বড় কারণ, আবহাওয়াও বাগড়া দিচ্ছে কিয়েভ সেনাদের অপারেশনে। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে তাদের দুর্দশা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কীভাবে? শুকনো পরিবেশে রুশ যান্ত্রিক ইউনিটগুলি সহজে চলাচল করার সুযোগ পাচ্ছে। এতে করে রুশ সেনাদের জন্য হামলা চালানো সহজতর হচ্ছে। সব মিলিয়ে ইউক্রেন যে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন, ইউক্রেনীয় ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের উপপ্রধান মেজর-জেনারেল ভাদিম স্কিবিটস্কির কথাতেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সম্প্রতি ইকোনমিস্টকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সব দিক দিয়েই সমস্যায় পড়ছি। আমাদের কাছে সেভাবে অস্ত্রশস্ত্র নেই। এর মধ্যে আবার শুষ্ক মৌসুম। তারা (রাশিয়া) এটা বেশ ভালো করেই জানত যে, এপ্রিল ও মে মাস আমাদের জন্য কঠিন সময় হবে।’

ইউক্রেনের গোয়েন্দাদের অনুমান, পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বটে, কিন্তু ইউক্রেনের অভ্যন্তরে বা সীমান্ত অঞ্চলে এখনো প্রচুরসংখ্যক সেনা প্রস্তুত রয়েছে লড়াইয়ের জন্য। ১ বা ২ লাখ নয়, ৫ লাখের বেশি সেনা প্রস্তুত রেখেছে মস্কো। স্কিবিটস্কির দাবি, মধ্য রাশিয়ায় ‘সেনা রিজার্ভ ডিভিশন’ তৈরি করছে রাশিয়া। এর আগে একইভাবে সেভার (উত্তর) নামে রুশ সামরিক গোষ্ঠী গঠন করেছিল মস্কো। ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের জর্জ ব্যারোসের ভাষ্য অনুযায়ী, সেভার হচ্ছে ‘গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল গ্রুপ’। ব্যারোসের মতে, ‘খারকিভ আক্রমণের জন্য সেনা রিজার্ভ ডিভিশনে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ সেনা প্রস্তুতের লক্ষ্য ছিল মস্কোর। তবে আমাদের ধারণা, অন্তত ৫০ হাজার সেনা প্রস্তুত রয়েছেন। এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে, এর বাইরেও প্রচুর সেনাশক্তি রয়েছে রাশিয়ার।’

নতুন ‘সেনা রিজার্ভ ডিভিশন’ থেকে সাঁজোয়া পদাতিক বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালানোর চেষ্টা করছে বলে জানা যাচ্ছে। এই পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে যদি অন্যান্য অভিজাত ইউনিট যোগ দেয়, তাহলে হামলার ভয়াবহতা আরো বাড়বে আগামী দিনগুলোতে। ইউক্রেনের এক বিশেষ বাহিনীর সাক্ষাত্কারেও এমন আভাস পাওয়া গেছে। ঐ বাহিনীর বক্তব্য, ‘সবে শুরু! আরো বড় হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে।’

সাবেক এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা ফ্রন্টেলিজেন্স ব্লগে লিখেছেন, ‘সেনাশক্তির ঘাটতিই ইউক্রেনকে বেশি ভোগাচ্ছে। সেনার অভাবে সীমান্তে বড় ইউনিট মোতায়েন করতে পারছে না কিয়েভ। তাছাড়া তত্ক্ষণাত্ অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে।’ এরূপ অবস্থায় ইউক্রেনের আন্তঃসীমান্তনিরাপত্তা ক্রমশ নাজুক হয়ে পড়ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সীমান্ত আক্রমণ পশ্চিমের সুমি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চাইছে রাশিয়া। রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী বিগত কয়েক মাস ধরে অভিযান চালিয়ে আসছে এই অঞ্চলে। অর্থাত্, রুশ হামলা নিশ্চিতভাবে আরো বাড়বে আগামী দিনগুলোতে।

সেভার গ্রুপের মতো সেনা রিজার্ভ ডিভিশনের গোটা খারকিভ শহর আক্রমণ ও দখল করার সক্ষমতা নেই। অর্থাত্, সম্ভবত অন্য কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে রুশ বাহিনী। ব্যারোস মনে করেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীকে দোনেস্ক থেকে খারকিভ অঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য করার জন্যই এই হামলা। ব্যারোস মনে করেন, রুশ সেনারা ইউক্রেনীয় বাহিনীকে দলছুট করে তা থেকে সুযোগ তৈরি করে নিতে চাইছে। বিশেষ করে দোনেস্ক অঞ্চল পুরোপুরি ফাঁকা করার মিশন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তারা, যা রাশিয়ার এই বছরের অন্যতম অপারেশনাল প্ল্যান।’

সাম্প্র্রতিক সময়ে রাশিয়া যেভাবে আন্তঃসীমান্ত আক্রমণ চালাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলোর প্রতিরোধ ভেঙে দিতে মরিয়া মস্কো। খারকিভ অঞ্চলে বেশ কয়েক মাস ধরে রুশ আক্রমণ স্থগিত ছিল, কিন্তু সেখানেই নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটছে। এর অর্থ, ইউক্রেনের অভ্যন্তরে ক্রেমলিন ‘বাফার জোন’ তৈরি করার চিন্তা করে থাকতে পারে। এরপর হয়তো-বা অন্যান্য শহরকেও টার্গেট করবে রুশ বাহিনী।

খারকিভে যা ঘটছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ্যে আনছে মস্কো। এভাবে আক্রমণ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের দুইটি গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ পায়—এক. সেনা ঘাটতি; এবং দুই. বিক্ষিপ্ত বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। পশ্চিমা সহায়তা ইউক্রেনের হাতে পৌঁছানোর আগেই রাশিয়া তড়িঘড়ি করে কিয়েভের এ দুই দুর্বলতা কাজে লাগাচ্ছে।

ইউক্রেনের এক সেনা গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় টেলিভিশনকে বলেছিলেন, রুশ সেনারা ক্ষীপ্রবেগে অগ্রসর হচ্ছেন। তারা প্রচুর পরিমাণ সেনা ও অস্ত্র মজুত করেছেন। সুবিশাল রুশ পদাতিক বাহিনী দিনরাত আক্রমণ করছে। বড় ও ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে তারা।’

ব্যারোস মনে করেন, ইউক্রেনের প্রশিক্ষিত সেনাঘাটতি তো আছেই, এর পাশাপাশি ইউক্রেনের আকাশসীমা রুশ সেনদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরো দূরপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা সম্পদ সরবরাহ করা একান্ত জরুরি। রুশ বিমান আটকানোর জন্য এটা অনেক বেশি জরুরি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুক্রবার ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা যুদ্ধাস্ত্র এবং অন্যান্য অস্ত্রের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বটে, কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট নয় বলেই মনে হচ্ছে। বরং আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন পড়বে। তা না হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অভাবের কারণে ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে। সহজ করে বললে, রুশ বাহিনীর তুলনায় ইউক্রেনীয় বাহিনী ব্যাপকভাবে পেছনে পড়ে যাবে।

একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ক্রাসনহোরিভকাতে ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলো বিগত কয়েক মাস ধরে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এবং একটি ইটের কারখানাকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। এই অবস্থান লক্ষ্য করে রুশ সেনারা হামলা চালালে তা ধূলিস্যাত্ হয়ে যায় খুব সহজেই। এক রুশ সামরিক ব্লগার দাবি করেছেন, রুশ আর্টিলারি ফায়ারের মুখে ইউক্রেনীয় সেনাদের এই আশ্রয়কেন্দ্র ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী কতটা প্রতিরক্ষাহীনতায় ভুগছে, তা বুঝতে আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

এমন একটি পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ সংশ্লিষ্ট ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা ‘সক্রিয় ও যুতসই’ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এ নিয়েই তারা বেশি কথা বলছেন। রুশ হামলা ঠেকানোর জন্য আরো ভালো ও শক্তিশালী ‘বিল্ডিং ব্লক’ তথা প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ নির্মাণের ওপর জোর দিচ্ছেন।

জেলেনস্কি সম্প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা তাদের (রুশ সেনা) থামাতে সক্ষম হব, যখন পর্যাপ্ত সাহায্য আসবে আমাদের হাতে। তবে স্বীকার করতে হয়,  পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন।’ এরকম একটি অবস্থায় জেলেনস্কি দাবি করেছেন, ‘এখন পর্যন্ত যে সহায়তা এসেছে, তা পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের আরো কিছু দরকার।’

চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্যারোস কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তার মতে,  রুশ সেনারা সময়ের অপেক্ষায় ছিল। মাঝে বেশ কিছু দিন দম মেরে ছিল রুশ বাহিনী। তবে আবারও বড় পরিসরে আক্রমণ শুরু করেছে তারা। এর অর্থ, রুশ সেনারা লড়াই করতে প্রস্তুত। ফলে ইউক্রেনীয় বাহিনীকেও প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে হবে।’

মার্কিন পদক্ষেপের ধীরগতির কারণেই যে যুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছে কিয়েভ, তাতে কোনো দ্বিমত নেই। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শোনা যায়। এতে করে যে নানা ধরনের সংশয়ের সৃষ্টি হচ্ছে, সে কথা বলাই বাহুল্য।

লেখক: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সিএনএন থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম