শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সিটি হলে বর্বর হামলা: তারপর কী হবে?

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:১৫

শুক্রবার ২২ মার্চ ২০২৪ সালে, চার সদস্যের এক কমান্ডো মস্কোর অদূরে ক্রাসনোগর্স্ক নামক উপশহরে অবস্থিত ক্রকাস সিটি হলে রক কনসার্টের শ্রোতাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাতাড়ি গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলে ১৩৩ জন মারা যান (পরবর্তী সময় মৃত্যুসংখ্যা বৃদ্ধি পায়) এবং ১৪০ জন আহত হন (এই সংখ্যাও পরে বৃদ্ধি পায়)। অতঃপর, কমান্ডো দলটি কনসার্ট ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়।

ইত্যবসরে, নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন চলে এলে, কমান্ডো দলটি কালো ছাদওয়ালা সাদা রঙের যে ‘রেনল্ট’ গাড়ি চালিয়ে এসেছিল, সেই গাড়িতেই চেপে পালানোর চেষ্টা করে, রুশ নিরাপত্তা সংস্থার লোকজন তাদের ধাওয়া করে; এই ধাওয়াপর্ব কম করে পাঁচ ঘণ্টা চলে এবং ইউক্রেনের সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করলে তাদেরকে আটক করে। অর্থাত্, সীমান্তের ওপারে, ইউক্রেনে তাদের জন্য কারো অপেক্ষা করার কথা ছিল। যাহোক, ক্রকাস সিটি হলে হত্যাযজ্ঞের প্রায় ৫৫ মিনিটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র ঘোষণা করেন যে, দুষ্কর্মটি আইসিসকে (ISIS-K) করেছে, ইউক্রেন কোনো সাতেপাঁচে নেই।

যাহোক, কমান্ডো সদস্যদের দেশ তাজিকিস্তান, তারা সবাই তাজিক। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তাদেরকে অর্থের বিনিময়ে হত্যার জন্য, অনলাইনে রিক্রুট করা হয়েছে। কর্মদাতার ঠিকানাপত্র তাদের জানা নেই। তাদের শরীর জামাকাপড় খানাতল্লাশি করে একখানা ভিজিটিং বা বিজনেস কার্ড পাওয়া গেছে; সেখানে নাম রয়েছে: দিমিত্র ইয়ারশ (Dmytro Yarosh)। খুব নামিদামি গুরুত্বপূর্ণ নাম এটি; ‘প্রাভি সেক্টর’ নামক মিলিশিয়া দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইয়ারশ, তিনি ইউক্রেনের নিরাপত্তা কাউন্সিলের দুই নম্বর ব্যক্তি ও সামরিক বাহিনীর প্রধানের উপদেষ্টা। রুশ কর্তৃপক্ষ তাই সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনকে দোষারোপ করেছে। ইয়ারশ যথারীতি তার দেশের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। এই চার তাজিক ছাড়াও পরে আরো সাত জন সহযোগী, সাকুল্যে ১১ জনকে আটক হয়েছে।

বিগত কয়েক বছর ধরেই আইসিসকে (আইসিস-খোরাসান) তুরস্ক থেকে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ক্রিয়াশীল, কাজ করছে; সন্ত্রাসী কর্মসাধন, ফান্ড-রেইজ, সংগতি প্রস্তুত ইত্যাদির ‘ফ্র্যানচাইজ’ হিসেবে কাজ করে। আইসিস-এর আবির্ভাব ঘটে উত্তর আফগানিস্তানে তাজিক ভিন্নমতাবলম্বী তাজিকদের উত্সাহে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সিরিয়া থেকে, যেমন : ইদলিব থেকে আরো কিছু আইসিসকে আফগানিস্তানে নিয়ে আসা হয়েছিল। এদের কাজ হলো তালিবান আন্দোলনকে ব্যতিব্যস্ত রাখা। এদের একটা অংশ উত্তর ইরানে সন্ত্রাসী ক্রিয়াকর্মের দায়িত্বে রয়েছে। অবশ্য, প্রসঙ্গক্রমে উল্লিখিত অঞ্চলেই যে আইসিস-এর কর্মতত্পরতার দক্ষতা প্রদর্শন সীমাবদ্ধ, মনে করার কারণ নেই। ওদের ফোকাস সুদূরপ্রসারী এবং ‘র্যাট-রান’ কায়দায় কাজ করে।’

আইসিস-এর দাবি অনুযায়ী ‘ক্রকাস’ হামলার কৃতিত্ব তাদের। এমন দাবির চমকপ্রদ দিক হলো যে, বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকেই, ‘মাইডানে’র রক্তাক্ত স্লাইপার শুটিং ও নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উচ্ছেদের পর থেকে ইউক্রেনে আইসিস-এর সমাবেশ বৃদ্ধি পায়। রাশিয়ার দাবি, আইসিস-এর কিছু কিছু সদস্যের ইউক্রেনের হয়ে রুশদের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রমাণাদি তাদের কাছে রয়েছে। ইউক্রেনের ‘ন্যাশনালিস্ট’ ও আইসিস-এর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার অন্যতম একজন হলেন দিমিত্র ইয়ারশ।

গ্রেফতারকৃত দুর্বৃত্তদের বর্ণনা থেকে এবং যে পদ্ধতিতে তারা অসামরিকদের বর্বরভাবে হত্যা করেছে, সেগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে—তারা আইসিস-এর আইডিওলজির বা আদর্শের অনুশীলনকারী নয়। আইসিস রিক্রুটের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি হলো শাহাদত বরণ করা, শহিদত্ব পাওয়া। সাধারণভাবে হামলাকারীরা ধার্মিক হতে পারে হয়তো, কিন্তু তারা অর্থের বিনিময়ে হত্যাযজ্ঞ সম্পাদন করেছে; অর্থাত্ তারা ভাড়াটে কর্মী। প্রতিরোধের মুখে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত গাড়িতে বসে পালানোর চেষ্টা করেছে। আসল আইসিস-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা না যাওয়া পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রাখত। তাদের আচরণ পদ্ধতিতে আরো কিছু অসামঞ্জস্য ছিল, যেমন—হামলাকারীরা হামলার ‘লাইভ ওয়েবকাস্টিং’ করেছে, যা অকৃত্রিম আইসিস কখনো করে না। (শ্রদ্ধাভাজন এলিজা জে. ম্যাগনিয়ারের ২৫.০৩.২৪-এর ‘এক্স’ পোস্ট দ্রষ্টব্য)।

সিআইএ প্রথম আদি আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠা করেছিল আফগানিস্তানে সোভিয়েটদের ফাইট দেওয়ার জন্য। দখলকৃত ইরাকে (২০০৩-২০১১) প্রথমে ইরাকি আল-কায়েদার আবির্ভাব ঘটে এবং এ থেকে সহজেই আইসিস/ইসলামিক স্টেট সৃষ্টি হয়; ‘আরব বসন্তে’র দিনগুলোতে ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের...ঘটনাবলি (২০১২, ১৩, ১৪...) অনেকেরই মনে আছে নিশ্চয়। ফরমায়েশমতো সন্ত্রাসী প্ল্যান সম্পাদনকারী হিসেবে আইসিসের ইমেজ ভালো নয়, সাধারণত তাদেরকে কার্য সম্পাদন শেষে ‘ইকসপেনডেবল/পরিত্যাগযোগ্য’ দলভুক্ত রাখা হয়। যেমন—তাই সিটি হলের দুর্বৃত্তরা যে গাড়িতে এসেছিল, ফিরতি পথের জন্যও একই গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। সিটি হলের দুর্বৃত্তদের জীবিত ধরার আপসহীন হুকুম ছিল বলে আক্ষরিক অর্থেই তারা ‘পরিত্যক্ত’ হয়নি। রুশ ইনটেলিজেন্স ‘এফএসবি’ ইত্যবসরেই প্রমাণ পেয়েছে যে, দুর্বৃত্তরা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মজুরির ৫০ শতাংশ আগাম পেয়েছিল, বাকি ৫০ শতাংশ পেত কাজ শেষে হলে, ইউক্রেনে।

আইসিস নিজের ইচ্ছামতো মাথা খাটিয়ে কিছু করে না। সাধারণভাবে, তিন স্তরে প্ল্যান রেডি হয়। প্রথম স্তরের চাহিদার তালিকা মিলিয়ে দ্বিতীয় স্তর এক দল ভাড়াটেকে সংঘবদ্ধ করে; এই স্তরটি তাই কোথায় কী হচ্ছে সবকিছু জানে, অর্থাত্ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের। অর্থ, মার্কেটিং, অর্ডার, লজিস্টিকস, অস্ত্র, ট্রেনিং ইত্যাদির তত্ত্বাবধান করে প্রথম স্তরটি। তাই আইসিস যদি বলে যে, সে ১২৩ করেছে, তবে সত্যিই করেছে—তবে এই ১২৩ করার অর্ডার আসে ওপর থেকে। সিটি হলের বর্বর ঘটনাটি তাড়াহুড়ো করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংঘটিত হয়নি। দস্তুরমতো প্রস্তুতি নিয়ে করা হয়েছে।

সাধারণত আইসিস-এর কম্ব্যাট অভিজ্ঞতা থাকে; পৃথিবীর কোথাও না কোথাও, যেমন :আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া, সুদান ইত্যাদি দেশ থেকে অভিজ্ঞতা থাকা সম্ভব। তাদের যদি কম্ব্যাট অভিজ্ঞতা থাকেও, তাদেরকে তবু সিটি হলের ভেতরে প্রবেশ করা, চার জনকে কীভাবে হাঁটাচলা করতে হবে, গুলি চালনা শেষে পালাতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে ট্রেনিং নিতে হয়েছে। কোথায় তাদের ট্রেনিং হয়, তার হদিস বের করবে রুশ ইনটেলিজেন্স ‘এফএসবি’।

প্রশ্ন হলো, এদের হ্যান্ডলার বা ‘হ্যান্ডলাররা’ কারা? ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ জোর গলায় বলেছেন যে কারা করেছে রাশিয়া তা বিলক্ষণ জানে, তবে ‘চূড়ান্ত অর্ডার কে দিয়েছে’ নিয়ে আগাম অনুমান করা ঠিক হবে না!

চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র অনড়ভাবে বলছে—‘ইউক্রেন জড়িত নেই’, অন্যদিকে হাইপার-নাছোড়বান্দার মতো বর্বর সন্ত্রাসের সবটুকু দায়দায়িত্ব আইসিসের, বলে দাবি করছে। তারা রুশদের তদন্তকর্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় না? বা তদন্ত হোক, চায় না! কেন?

এই আইসিস-বর্বরতা আমাদেরকে নতুন সন্ধিক্ষণে নিয়ে এসেছে।

লেখক: ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও বিজ্ঞানলেখক

ইত্তেফাক/এসটিএম