শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

'পুতিনের ভূমিধস বিজয়' কারো সর্বনাশ, কারো পৌষ মাস

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩০

ভূমিধস বিজয়ের মাধমে নতুন মেয়াদে আগামী ছয় বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন। আমরা জানি, ভোটের আগে রাশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন পুতিন প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। পুতিনের বিপক্ষে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো তেমন কোনো প্রার্থীও ছিলেন না। বলা যায়, একদম ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন রুশ স্বৈরশাসক।

চলমান ইউক্রেনে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পুতিনের আবারও ক্ষমতায় আসার অর্থ হচ্ছে, এই সংঘাত এগোতে থাকবে সামনের দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের মিত্র দেশগুলোর জন্য এটা খারাপ সংবাদ নিঃসন্দেহে। অন্যদিকে, পুতিনের নির্বিঘ্নে ক্ষমতার মসনদে বসার খবরে যারপরনাই খুশি হবে কিছু দেশ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চীনের কথা। শি জিনপিং এবং পশ্চিমাবিরোধী অন্যান্য নেতা পুতিনের বিজয়ে উল্লাস করবেন—সেটাই স্বাভাবিক।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত প্র্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, পুতিন ভোট পেয়েছেন প্রায় ৯০ শতাংশ। এই বিশাল বিজয়ে পুতিনকে তত্ক্ষণাত্ অভিনন্দন জানাতে ভোলেননি শি। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, শি সেদিনই ফোনে রুশ নেতাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘পুতিনের পুনর্নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার প্রতি ‘রুশ জনগণের সমর্থনের প্রতিফলন ঘটেছে।’ রুশ প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করে শি বলেন, ‘আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরো টেকসই এবং উন্নত করতে বেইজিং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে এ ধরনের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে এটা বেশ ভালো করেই বোঝা যায়, দুই দেশের সম্পর্ক কতটা ‘গভীর’। বস্তুত, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক অনেক বেশি মজবুত হয়েছে বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেইজিংয়ের দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে পড়তে দেখা যায় ক্রেমলিনকে। এই সময়ে পুতিন-শি সম্পর্কও আরো জোরদার হয়েছে। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘সীমাহীন অংশীদারিত্ব’ উপভোগ করছে দুই দেশ।

আমরা দেখেছি, কিয়েভে অযাচিত আগ্রাসন চালানোর জন্য মস্কোর ওপর যখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল ওয়াশিংটন, তখন প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, এর জন্য বেশ চড়া মূল্যই চোকাতে হবে রাশিয়াকে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে রাশিয়ার গায়ে কোনো ধরনের আঁচড়ই কাটতে পারেনি ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা’! বরং চীনের কাছ থেকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে আসছে রাশিয়া। নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য যখন একজোট হয়, তখন মস্কোর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় বেইজিং। ইউক্রেনে আগ্র্রাসন চালানোর বিষয়ে চীন রাশিয়ার নিন্দা তো করেইনি, উলটো রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চালিয়ে গেছে বহাল তবিয়তে। মূলত এ থেকে বেইজংয়ের ওপর ক্ষুব্ধ হতে শুরু করে ইউরোপ। আশঙ্কা করা হয়, রাশিয়া যেভাবে গায়ের জোরে ইউক্রেনকে কবজা করেছে, ঠিক সেভাবেই তাইওয়ানের স্বশাসিত গণতন্ত্র নিয়ে নীলনকশায় উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে বেইজিং। আর তার ফলে এই অঞ্চলে অবধারিত হয়ে উঠতে পারে নতুন সংঘাত, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

অতি সম্প্রতি ন্যাটোর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, এতে বেইজিংয়ের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করা হয়েছে। চীনের ওপর পশ্চিমারা বেশ ঝাল ঝেড়েছেন! ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টলটেনবার্গ কড়া ভাষায় বলেছেন, ‘বেইজিং আমাদের মূল্যবোধকে পাত্তা দেয় না। শুধু তাই নয়, আমাদের স্বার্থকে তারা চ্যালেঞ্জ করে।’

এ ধরনের কথার সোজা অর্থ হলো, বেইজিং মস্কোর দিকে ঝুঁকেছে। সত্যি বলতে, শিকে ‘এক গভীর লক্ষ্যে মনোনিবেশ’ করতে দেখা যায়। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে পুতিনকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন শি। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে দুই নেতা শি ও পুতিন ‘এক অন্য বিশ্ব’ বিনির্মাণের স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠেছেন।

নতুন বিশ্বব্যবস্থা (নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার) গড়ার ক্ষেত্রে উভয় নেতা সম্ভবত এমন বিশ্বাসও পোষণ করছেন যে, ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা যে ধরনের নিয়মনীতি ও মূল্যবোধের কথা বলে থাকে, তা ‘সম্পূর্ণ অন্যায় আধিপত্য’ ছাড়া আর কিছু নয়। এরকম এক প্রেক্ষাপটে শি ধারণা করে বসে আছেন, মস্কো-বেইজিং স্থিতিশীল সম্পর্ক ধরে রাখা গেলে কেবল তাইওয়ান কেন, দক্ষিণ চীন সাগরের মতো উদ্বেগজনক ইস্যুগুলো নিয়েও নির্বিঘ্নে সামনে এগুনো যাবে। হয়তোবা এমন চিন্তা থেকেই পুতিনকে ‘একজন প্রকৃত কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে দেখেন শি। ঠিক এমনটাই মনে করেন লন্ডন ইউনিভার্সিটির চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে তিনি এক মন্তব্যে বলেছিলেন, ‘যদি এমন হতো, এই নির্বাচনে পুতিনের কোনো অঘটন ঘটেছে, তাহলে সবার আগে কপাল পুড়ত বেইজিংয়ের।’ পুতিন-শি অংশীদারিত্ব কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা এই একটি কথার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়।

মনে রাখতে হবে, মাও সেতুংয়ের পর শিই একমাত্র নেতা, যিনি চীনা জাতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। একই চিত্র লক্ষণীয় পুতিনের বেলায়ও। সোভিয়েত জমানার মহাপ্রতাপশালী শাসক জোসেফ স্ট্যালিনের পর দীর্ঘ মেয়াদে রাশিয়াকে শাসন করা নেতা হচ্ছেন পুতিন। এমনকি তিনি রাশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের শাসক হয়ে উঠবেন বলেই মনে করা হয়।

যা হোক, পুতিনের সাফল্যে শির পাশাপাশি খুশি হবেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। সম্প্রতি পুতিনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও হয়েছে এই স্বৈরশাসকের। শি-পুতিনের মতো কিম-পুতিন সম্পর্কও বেশ মজবুত। অর্থাত্, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ভালো অংশদারত্ব দেখা যাবে সামনের দিনগুলোতে।

ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে, পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে সম্প্রতি অস্ত্র কিনেছে মস্কো। মজার ব্যাপার হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ কিমের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। এই যুদ্ধের ফলে মস্কো-পিয়ংইয়ং দৃঢ় বন্ধনের সুযোগে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রয়াস পেয়েছেন কিম। ফলে শির মতো স্বভাবতই পুতিনকে বিজয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসিয়েছেন কিমও। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ের পর পুতিনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কিম।

পুতিনের বিজয়ে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো স্বস্তি পেয়েছে ইরানও। মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় বিধ্বস্ত তেহরান সরকার বেশ কিছুদিন ধরেই মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতা প্রসারিত করে আসছিল। মস্কোকে ড্রোন ও গোলাবারুদ সরবরাহসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বস্তুত লাভবান হচ্ছে দুই দেশই। ভবিষ্যতে এ দুই দেশের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে নিশ্চিতভাবেই।

পুতিন যুগের ধারাবাহিকতায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা দেশের তালিকায় রয়েছে ভারতের নামও। আমরা লক্ষ করছি, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান লেনদেনের মধ্য দিয়ে লাভবান হচ্ছে দিল্লি সরকার। ছাড়ে জ্বালানি তেল কেনার মধ্য দিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে মোদি সরকার।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে তলে তলে। কিছু দেশ আছে, যারা ইউক্রেনকে সমর্থন করে যুদ্ধের অভিঘাতের শিকার হয়েছে। অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ধসে গেছে অনেক দেশের। মুখে কিছু না বললেও পুতিনের জয়ে মিটিমিটি হাসছে এসব দেশ!

সত্যি বলতে, পুতিনের নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য সতর্কসংকেত হলেও অনেক দেশই এতে খুশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মস্কোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দেশগুলো ইউক্রেনের সংঘাত বন্ধের বিপক্ষে। মূলত রাশিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি যুদ্ধের অভিঘাত এড়িয়ে চলতে চায় দেশগুলো। কোনো সন্দেহ নেই, আজকের বিশ্বে বড় বাস্তবতা এটাই।

লেখক :হংকংভিত্তিক চীনা বিশেষজ্ঞ

ও রাজনীতি বিশ্লেষক

সিএনএন থেকে অনুবাদ :সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন