প্লানেট-বি নাই, প্লান-বি-এরও সুযোগ নাই

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৬:০০

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু সংকট আছে, যাহা এক দিনে জন্মে না, আবার এক দিনে দৃশ্যমানও হয় না। তাহারা ধীরে ধীরে আসে, সতর্কবার্তা দেয়, তথ্য দেয়, সংকেত দেয়; কিন্তু মানুষ যদি তাহা উপেক্ষা করে, তখন একসময় সংকটটি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা থাকে না-বর্তমানের বাস্তবতায় পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে আমরা আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই উপস্থিত। সম্প্রতি বিশ্বের ৭০ জনেরও অধিক শীর্ষ জলবায়ু বিজ্ঞানী এক যৌথ গবেষণায় বলিয়াছেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়িতেছে, সমুদ্রের তাপপ্রবাহ রেকর্ড ভাঙিতেছে, বরফ গলনের গতি ত্বরান্বিত হইতেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতর হইতেছে এবং সর্বোপরি-জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ সূচকসমূহ ক্রমাগত অবনতির দিকে ধাবিত হইতেছে।

আইরিশ বিজ্ঞানী পিটার থর্ন একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপমা ব্যবহার করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, এই সূচকগুলিকে এমন এক রোগীর ‘ভাইটাল সাইন’-এর সহিত তুলনা করা যায়, যাহার শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত অবনতিশীল। উপমাটি যথার্থ। কারণ পৃথিবী আজ যেন জ্বরে আক্রান্ত এক রোগী এবং বিজ্ঞানীরা সেই রোগীর থার্মোমিটার, রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করিতেছেন; কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হইল, রোগীর অবস্থা যেমন খারাপ হইতেছে, তেমনি চিকিৎসকের হাতে থাকা যন্ত্রপাতিও দুর্বল হইয়া পড়িতেছে। পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্যাটেলাইট, সমুদ্রবয়া ও বৈজ্ঞানিক তথ্যসংগ্রহ ব্যবস্থার অর্থায়ন বিভিন্ন দেশে সংকুচিত হইতেছে। পরিসংখ্যানগুলির দিকে তাকাইলেই পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবন করা যায়। ২০২৫ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাশিল্পযুগের তুলনায় প্রায় ১.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহার মধ্যে ১.৩৭ ডিগ্রিই মানব কর্মকাণ্ডের ফল। অর্থাৎ এই উষ্ণতা প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রের নয়-ইহা মানুষেরই সৃষ্ট। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বিশ্বনেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিবার চেষ্টা করা হইবে; কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলিতেছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকিলে ২০৩০ সালের মধ্যেই সেই সীমা অতিক্রান্ত হইবে।

ইহার মধ্যেই অ্যান্টার্কটিকা হইতে আসিতেছে আর এক ভয়ংকর সংবাদ। ফ্রান্সের সমান আয়তনের সমুদ্রবরফ উধাও হইয়া গিয়াছে। যেই অঞ্চলে এই সময় বরফে আচ্ছাদিত থাকিবার কথা, সেইখানে এখন প্রায় সম্পূর্ণ বরফহীন সমুদ্র। অ্যান্টার্কটিকার বেলিংসহাউসেন সাগরে এই ঘটনা গত চার বৎসরে তৃতীয় বার ঘটিল। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ইহা আর ব্যতিক্রম নহে-ইহা একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা। প্রকৃতির জগতে কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন নহে। বরফ গলিলে কেবল বরফই হারায় না। পেঙ্গুইনের প্রজনন ব্যাহত হয়, হাজার হাজার ছানার মৃত্যু ঘটে, ক্রিল নামক ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, খাদ্যশৃঙ্খল দুর্বল হয়। পরবর্তীকালে সেই প্রভাব বৃহত্তর সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের উপরও পতিত হয়। ইহার পাশাপাশি বরফের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ দুর্বল হইলে বৃহৎ হিমবাহ অধিক দ্রুত গলিতে শুরু করে, যাহা বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ হয়; কিন্তু এই সংকটের সবচাইতে উদ্বেগজনক দিক অন্যত্র। পৃথিবী যখন দ্রুত উষ্ণ হইতেছে, তখন মানবসমাজের মনোযোগ ক্রমশ অন্যদিকে সরিয়া যাইতেছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানিসংকট, অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ জলবায়ু প্রশ্নকে পশ্চাতে ঠেলিয়া দিতেছে। ঘরের ছাদে আগুন লাগিয়াছে; কিন্তু মানবজাতি যেন ঘরের আসবাব লইয়া তর্ক করিতে ব্যস্ত!

আজ অ্যান্টার্কটিকার গলিত বরফ, উত্তপ্ত সমুদ্র, বিলীয়মান প্রাণবৈচিত্র্য এবং দ্রুত নিঃশেষ হইতে থাকা কার্বন বাজেট আমাদের সেই সত্য পুনরায় স্মরণ করাইতেছে-খোদার উপর খোদকারি চলে না। এই কারণে প্রশ্ন এখন আর এই নহে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটিতেছে কি না। প্রশ্ন হইল-আমরা কি এখনও যথাসময়ে প্রতিক্রিয়া জানাইতে সক্ষম হইব? আমরা বহুবার বলিয়াছি, আমাদের আরেকটি প্লানেট-বি নাই, সুতরাং কোনো প্লান-বি-এর সুযোগ নাই। রোগীর জ্বর যখন থার্মোমিটারের সীমা ছাড়াইতে চাহে, তখন চিকিৎসার বিলম্ব মানে রোগীর জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান হ্রাস করা। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও আজ যেন সেই সময়ই উপস্থিত।

ইত্তেফাক/এমএস