একদিন যাহারা আমাদের হাত ধরিয়া পথ দেখাইয়াছেন, আজ তাহাদের পথ চলিবার সময় আমরা কি পাশে আছি? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নাই! মুখে আমরা বলি, 'বিপদে মোরা ভয় করি না, সঙ্গে আছে প্রবীণ সেনা'; কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় এই কথার সহিত নির্মম পরিহাস করে। কারণ, আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, যাহারা জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ব্যয় করিয়াছেন, বার্ধক্যে উপনীত হইয়া সেই তাহাদের অনেককেই চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় ও ন্যূনতম সেবার জন্য নির্ভর করিতে হয় অন্যের করুণার উপর। আরও বেদনাদায়ক হইল, প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকিলেও তাহার অনেক কিছুই কাগজে কলমে বা ভবনের দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিয়া যায়। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৫ শয্যার 'শান্তি নিবাস' ইহারই একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বৎসর পরও প্রতিষ্ঠানটি চালু হয় নাই। কক্ষের বিছানা-আসবাব ধুলায় ঢাকা, বৃষ্টির পানিতে বাক্সবন্দি চিকিৎসাসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ শেষ; এমনকি বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে সংযোগও বিচ্ছিন্ন। সংশ্লিষ্টদের দাবি হইল, জনবল ও বরাদ্দ না থাকায় প্রতিষ্ঠান চালু করা যায় নাই। তবে কি পরিকল্পনার সময় এই বিষয়গুলি বিবেচনাতেই ছিল না?
একই ধরনের 'ভবন আছে, সেবা নাই' চিত্র দেখা যায় কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। বাহিরে ঠিকই ১০০ শয্যার হাসপাতাল, তথাপি ভিতরে ৫০ শয্যার জনবল। অপারেশন থিয়েটার রহিয়াছে বটে; কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরিয়া অস্ত্রোপচার বন্ধ। আছে এক্সরে যন্ত্র; কিন্তু টেকনিশিয়ান না থাকায় রোগীর কাজে আসে না: আছে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন; কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাবে নিয়মিত সেবা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণের পরও তাহা মানুষের কাজে আসিতেছে না। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থকে এইভাবে অব্যবহার বা অপচয় করা হইবে কেন? পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতির দায় কাহার?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১-২০৩০ সময়কে 'সুস্থ বার্ধক্যের দশক' হিসাবে গ্রহণ করিয়া প্রবীণদের জন্য বয়সবান্ধব পরিবেশ, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার উপর গুরুত্ব দিয়াছে। উন্নত দেশসমূহেও প্রবীণসেবা ক্রমশ হাসপাতালকেন্দ্রিকতার বাহিরে গিয়া পরিবার, স্থানীয় সমাজ, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনিবার দিকে অগ্রসর হইতেছে। আমাদেরও সেই বাস্তবতা বুঝিতে হইবে। প্রবীণদের জন্য ভবন বানাইয়া দরজা তালাবদ্ধ রাখিলে দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং সেই দরজা খুলিয়া সেবা পৌঁছাইতে হয় মানুষের কাছে। কেবল একটি শয্যা বা ভবন নহে, নিয়মিত চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা, নিরাপদ আবাসন এবং সর্বোপরি মর্যাদাপূর্ণ জীবনই প্রবীণরা কামনা করেন। তবে পরিতাপের বিষয়, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নহে। চলতি বৎসরের শুরুতে দেশের একমাত্র সরকারি প্রবীণ হাসপাতালের উন্নয়নকাজ অর্থাভাবে বন্ধ থাকার খবর প্রকাশিত হইয়াছে। অথচ দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়িতেছে। অর্থাৎ, ইহা কেবল একটি হাসপাতাল বা একটি নিবাসের সংকট নহে; বরং ইহা আমাদের মূল্যবোধের সংকট। কর্মক্ষেত্র, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে অবদান রাখিবার পর জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া প্রবীণরা যদি অবজ্ঞা-উপেক্ষার শিকার হন, তাহা হইলে রাষ্ট্রের উন্নয়নের কী অর্থ রহিবে?
প্রবীণদের যত্ন কেবল রাষ্ট্রের কাজ নহে; ইহা আমাদের পারিবারিক ও মানবিক দায়িত্বও। মনে রাখা প্রয়োজন, বয়স কোনো দূরবর্তী গন্তব্য নহে-আমরা প্রত্যেকেই সেই পথের যাত্রী। আজ যাহাদের জন্য আমরা একটি শান্তি নিবাসের দরজা খুলিতে পারিতেছি না, কাল হয়তো সেই দরজার প্রয়োজন হইবে আমাদেরই। অতএব, রাষ্ট্রকে এখনই প্রবীণদের জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। প্রবীণদের সুরক্ষায় কেবল ভবন নির্মাণ করিলেই চলিবে না, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতাও নিশ্চিত করিতে হইবে। পরিবার এবং সমাজকেও তাহাদের প্রতি হইতে হইবে দায়িত্বশীল। প্রবীণদের সুরক্ষা ও মর্যাদা দিতে না পারিলে 'মর্যাদাবান সমাজ' গড়িয়া উঠিবে কীভাবে?
