প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। সভ্যতার বিবর্তনে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, উৎপাদনব্যবস্থা বদলেছে, এসেছে শিল্পবিপ্লব, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত হিসেবে খাদ্যের গুরুত্ব অপরিবর্তিত। আর সেই খাদ্যের প্রধান জোগানদাতা কৃষক। পৃথিবীর অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যত আধুনিকই হোক, কৃষি ও কৃষকের অবদানকে উপেক্ষা করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট এবং বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ যত বাড়বে, কৃষকের গুরুত্ব ততই বাড়বে। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), বিগ ডেটা, রোবোটিকস, ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি কৃষির প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। এসব প্রযুক্তি কৃষিকাজকে সহজ, দ্রুত ও অধিকতর তথ্যনির্ভর করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, ফসল উৎপাদনের জন্য মাটি, পানি, সূর্যের আলো, উপযুক্ত তাপমাত্রা, ঋতুচক্র এবং জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অতএব, আগামীর পৃথিবীতে প্রযুক্তি হবে কৃষকের শক্তি, আর কৃষি হবে মানুষের অস্তিত্ব ও সভ্যতার ভিত্তি।
শিল্পবিপ্লবের সময় যন্ত্র মানুষের শারীরিক শ্রমের বড় অংশের বিকল্প হয়ে উঠেছিল। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব মানুষের যোগাযোগ, ব্যবসা ও জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি বদলে দিয়েছে। বর্তমানে এআই মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং জটিল সমস্যা সমাধানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কৃষিও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। স্যাটেলাইট চিত্র, মাটির সেন্সর, ড্রোন এবং এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ কৃষককে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে। উদাহরণস্বরূপ, ধানের জমিতে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে কৃষক মোবাইল ফোনে ছবি তুলে সম্ভাব্য রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার পরামর্শ পেতে পারেন। মাটির আর্দ্রতা পরিমাপ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া সম্ভব এআইর মাধ্যমে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস কাজে লাগিয়ে বৃষ্টির আগে সার প্রয়োগ বা কীটনাশক ছেটানোর অনুপযুক্ত সময় এড়ানো যায়। ফলে উৎপাদন খরচ কমানো, অপচয় হ্রাস এবং পরিবেশের ক্ষতি সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
এআই কি খাদ্য উৎপাদনের সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির সব অনিশ্চয়তা দূর করা যায় না। কৃষি মূলত একটি জীবন্ত ঔ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বীজের অঙ্কুরোদগম, শিকড়ের বৃদ্ধি, মাটির অণুজীবের কার্যক্রম, পরাগায়ন, পানি ও পুষ্টি শোষণ, সবকিছুই জটিল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রযুক্তি এসব প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির কার্যক্রমের সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। একটি সেন্সর মাটির আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। কিন্তু মাটির জৈবপদার্থ, অণুজীবের বৈচিত্র্য, মাটির গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা রক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। একইভাবে, এআই কোনো রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ শনাক্ত করতে পারলেও মাঠপর্যায়ে সঠিক পর্যবেক্ষণ, রোগের নিশ্চিতকরণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন থেকেই যায়।
আগামী দিনের কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে জলবায়ু পরিবর্তন। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষকের জীবিকা ও ফসল উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি আগাম সতর্কতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি থাকলেই জলবায়ুঝুঁকি দূর হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল জাত, পানি সংরক্ষণ, উন্নত নিষ্কাশনব্যবস্থা, মাটির জৈবপদার্থ বৃদ্ধি, ফসলের বহুমুখীকরণ, কৃষি গবেষণা এবং কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা। কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় উৎপাদনের পরিমাণকে প্রায়ই প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অধিক উৎপাদনই টেকসই কৃষির একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে কিংবা উপকারী পোকামাকড় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে উৎপাদন বাড়ানো হলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সমাজকেই দিতে হয়।
অতিরিক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সার ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগ, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং একটানা একই ফসল চাষ মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে এবং খাদ্য ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। এআই ও আইওটি প্রযুক্তি মাটির পুষ্টি, অম্লত্ব, আর্দ্রতা ও লবণাক্ততার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনভিত্তিক সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। তবে সেন্সরের তথ্যের যথার্থতা, স্থানীয় মাটি ও ফসল অনুযায়ী ক্যালিব্রেশন এবং পরীক্ষাগারে যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু যন্ত্রের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে কৃষিবিদ ও গবেষকদের পরামর্শের সঙ্গে এসব তথ্য সমন্বয় করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষকের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। অনেকের জমির পরিমাণ কম, পুঁজি সীমিত এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও অসম। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা যদি শুধু বড় খামার বা উচ্চ বিনিয়োগক্ষমতাসম্পন্ন উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কৃষিতে বৈষম্য আরো বাড়তে পারে। এ কারণে কৃষিপ্রযুক্তিকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, স্থানীয় ভাষাভিত্তিক এবং ব্যবহারবান্ধব করতে হবে। কৃষকের হাতে স্মার্টফোন থাকলেই তিনি কার্যকরভাবে ডিজিটাল কৃষিসেবা ব্যবহার করতে পারবেন, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজ নির্দেশনা এবং মাঠপর্যায়ে সহায়তা। বাংলা ভাষায় এআইভিত্তিক কৃষি পরামর্শ, ছবি দিয়ে রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে এসব সেবা আরো কার্যকর করা সম্ভব।
আগামীর কৃষি শুধু উৎপাদনকেন্দ্রিক থাকবে না; এটি তথ্য, সেবা, বাজার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হবে। কৃষক উৎপাদনের পাশাপাশি মানসম্মত বীজ নির্বাচন, ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, উৎপাদন ব্যয় হিসাব, বাজার বিশ্লেষণ, পণ্য সংরক্ষণ এবং সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফরম কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে তথ্যের ব্যবধান কমাতে পারে। কৃষিপণ্যের উৎপাদনস্থান, সংগ্রহের সময়, গুণমান এবং সরবরাহের তথ্য সহজলভ্য হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে এর সুফল পেতে সংরক্ষণাগার, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগও প্রয়োজন। তবে যন্ত্রের কারণে কৃষিশ্রমিকের কাজের ধরন বদলাতে পারে। তাই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা থাকতে হবে। কৃষকের উন্নয়ন বলতে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়; তার আয়, মর্যাদা, কর্মসংস্থান ও জীবনমানের উন্নয়নকেও বুঝতে হবে।
ভবিষ্যতের কৃষিনীতি কেমন হওয়া উচিত : বাংলাদেশের আগামীর কৃষিকে শক্তিশালী করতে গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি। স্থানীয় মাটি, পরিবেশ ও ফসলের উপযোগিতা যাচাই করে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সহজলভ্য কৃষিসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য, পানির সাশ্রয়, জীববৈচিত্র্য, নিরাপদ খাদ্য ও কার্বন নিঃসারণ হ্রাসকে কৃষির সাফল্যের সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সর্বোপরি, কৃষককে প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং উদ্ভাবন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার করতে হবে।
পৃথিবী যতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির যুগে এগিয়ে যাক, খাদ্য উৎপাদনে প্রকৃতি ও কৃষকের গুরুত্ব অপরিবর্তনীয়। প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়াতে, অপচয় কমাতে এবং কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে; কিন্তু উর্বর মাটি, বিশুদ্ধ পানি, সূর্যের আলো ও জীববৈচিত্র্যের বিকল্প হতে পারে না। তাই আগামীর কৃষি হবে প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। কৃষকের জ্ঞান, শ্রম ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ই নিশ্চিত করবে খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই গ্রামীণ উন্নয়ন। প্রযুক্তি হবে শক্তি, প্রকৃতি হবে ভিত্তি, আর কৃষক হবেন আগামীর কৃষির প্রধান চালিকাশক্তি।
লেখক : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
