আয় বুঝিয়া ব্যয় করিতে হইবে

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ০৬:০০

করোনার কারণে সংঘটিত লকডাউনের পর এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উত্থান ঘটিতেছে বলিয়া মনে করা হইতেছিল। কিছুদিন পূর্বে রয়টার্সের এক জরিপে জানা গিয়াছে, এই বত্সর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পালে এতটাই হাওয়া লাগিবে যে, ১৯৭০ সালের পর যাহা নাকি আর দেখা যায় নাই! উত্তম কথা। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নতির পালে হাওয়ার পরিবর্তে ঝড়ও বহিয়া যাইতে পারে। তাহার কিছু আলামত বিশ্বের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখিতে পাইতেছেন। ইতিমধ্যে ভূরাজনৈতিক কারণ, কয়লার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রাশিয়া ও চীনের মজুতদারি জ্বালানিসংকটকে তীব্র করিয়া তুলিয়াছে। গ্যাস, কয়লা ও তেলের চাহিদা অব্যাহতভাবে বাড়িয়াই চলিতেছে। বেশ কিছুদিন ধরিয়া স্মরণকালের ভয়াবহ কয়লাসংকটে পড়িয়াছে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন। ইহাতে চীনের কয়েকটি প্রদেশে ব্যাহত হইতেছে বিদ্যুত্ সরবরাহ। বাধাগ্রস্ত হইতেছে শিল্প উত্পাদনও। চীনের কয়লা আমদানিতে বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে অস্ট্রেলিয়া। চলতি সপ্তাহে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইম’ জানাইয়াছেন, চীন-অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য উন্নয়নে চীনের জ্বালানিসংকট সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখিবে। একই রকম অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতেছে ইউরোপও। সেইখানে গ্যাসের মূল্য বাড়িতেছে। জানুয়ারির তুলনায় ২০০ শতাংশ বাড়িয়াছে বিদ্যুতের মূল্য। একই সঙ্গে সারা বিশ্বে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাইতেছে লাগামহীনভাবে। শিল্পোত্পাদনের সহিত সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে ভাবিতে হইতেছে, তাহারা উত্পাদন অব্যাহত রাখিবে, নাকি নাগরিকদের ভালো রাখিবে! ডিসেম্বরে বড়দিনের জন্য উত্পাদন যতখানি বৃদ্ধি করা হইয়াছে, ততখানি বিতরণ সম্ভব হইবে কি না তাহাও নূতন করিয়া দুশ্চিন্তা তৈরি করিতেছে।

এইদিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপান ক্রমশ চীনকে ‘কৌশলগত হুমকি’ হিসাবে দেখিতেছে। পূর্ব চীন সাগরে চীনের সঙ্গে জাপানের একটি বিদ্যমান আঞ্চলিক বিরোধ রহিয়াছে। ইতিমধ্যেই চীন কর্তৃক আরোপিত আমদানির শুল্কের ঝামেলায় রহিয়াছে অস্ট্রেলিয়া। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি বা ইউএসএমসিএর মাধ্যমে কানাডা ও মেক্সিকো চীনের পথে বাধা হইয়া দাঁড়াইতে পারে। তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনকে দাবাইয়া রাখা সম্ভব হইবে না। বরং সমস্যায় পড়িতে পারে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি। গ্লোবাল কম্পিটিটিভ রিপোর্ট বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা উন্নয়নশীল দেশসমূহে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পথে সবচাইতে বড় বাধা। প্রতিবন্ধকতা হিসাবে ইহার পর রহিয়াছে যথাক্রমে দুর্নীতি, অর্থায়নের সমস্যা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, উচ্চ কর, শ্রমিকদের অদক্ষতা ও নীতিগত অস্থিতিশীলতা। সুনির্দিষ্টভাবে, এশিয়ার অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো আমদানি-রপ্তানিতে পিছাইয়া রহিয়াছে। এশিয়া অঞ্চলে যেইখানে রপ্তানি বাণিজ্যে গড়ে ১৮ দিন সময় লাগে, সেইখানে বাংলাদেশ হইতে রপ্তানি করিতে সময় লাগে ২৮ দিন। আমদানির বেলাতেও সমস্যা প্রকট। এই ক্ষেত্রে এশিয়া অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশের ১৪ দিন অধিক সময় লাগে। আরো দুশ্চিন্তার কথা হইল, সম্প্রতি পণ্যবাহী জাহাজের খরচ ৪০০ হইতে ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। এমতাবস্থায় যাহারা ইতিমধ্যে আমদানি অর্ডার করিয়াছেন, তাহাদের নিকট নূতন করিয়া খরচ বৃদ্ধির আবেদন আসিতেছে।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সমগ্র পৃথিবীই অর্থনৈতিক দোলাচলে কাঁপিতেছে। এই অবস্থায় তৃতীয় বিশ্বে অর্থনৈতিক সমস্যার অজানা ও নূতন কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনিতেই আমরা সকল ক্ষেত্রে বাহিরের উপর নির্ভরশীল। রেমিট্যান্সসহ এক-আধটি বিষয় ছাড়া আমাদের পাত্রটি এক অর্থে শূন্য। সুতরাং সতর্ক থাকিতে হইবে। ইহা আমরা বুঝিতেছি কি না কিংবা কতখানি বুঝিতেছি, তাহা গুরুত্বের সহিত চিন্তা করা দরকার। আমাদের মুদ্রাস্ফীতি অধিক বৃদ্ধি পাইতে পারে, টাকার মান কমিয়া যাইতে পারে। সুতরাং আমাদের এখন আয় বুঝিয়া ব্যয় করা প্রয়োজন। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন