অনলাইন স্কুল ও আমাদের অর্জন

আপডেট : ২০ মে ২০২০, ১৫:২৯

ইউনেস্কো এক প্রেস রিলিজে জানায় যে কোভিড-১৯ পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিশ্বের প্রায় ১৬৫টি দেশের ১.৫ বিলিয়ন শিক্ষার্থী পড়াশুনা থেকে বিচ্ছিন্ন। এই অবস্থায় সংস্থাটি #LearningNeverStops শ্লোগানে বৈশ্বিক শিক্ষা সমঝোতা বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছে। মাইক্রোসফট, ফেসবুক, জুম, জিএসএমএ, গুগল, কোর্সেরার মতো বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের এই ঐক্যে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য।

ইউনেস্কো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য শিক্ষা বিষয়ক যে গাইডলাইন প্রকাশ করেছে সেখানে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার কথা উল্লেখ করেছে। দশটি সুপারিশের মধ্যে গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে ডিজিটাল টুল ব্যবহার করে শিক্ষককে ক্লাস নেয়া এবং তা টিভি অথবা অন্য কোন মাধ্যম ব্যবহার করে সম্প্রচার করার বিষয়টি।

এই অবস্থায় বাংলাদেশও প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি শিক্ষা চলমান রাখার জন্য সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন রকম কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ এর বিস্তার প্রতিরোধে মার্চের মাঝামাঝি থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করে। তার অল্প কিছুদিন পর হতেই আইসিটি ডিভিশনের এটুআই প্রোগ্রামের কারিগরি সহায়তায় টেরিস্টেরিয়াল চ্যানেল সংসদ টিভির মাধ্যমে ক্লাস সম্প্রচার শুরু করে। এছাড়াও অনলাইন ক্লাস, ফেসবুকে লাইভ ক্লাস ইত্যাদি কার্যক্রম শুরু হয়। আমাদের দেশে সকল শিক্ষার্থীর জন্য এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে ক্লাসে অংশগ্রহণ সম্ভব না হলেও আস্তে আস্তে তাতে অভ্যস্ত না হয়ে উপায় নাই। কেননা বিশ্বের ধনী গরীব প্রায় প্রতিটি দেশই এই একই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে কোভিড-১৯ এর সময়কালে শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি দেশের উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো স্বচ্ছ হয়ে যাবে। ইথিওপিয়ায় সরকারিভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ই-টেক্সটবুক বিতরণ করেছে, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ প্যালেস্টাইনে সরকারি ভাবে ই-লার্নিং পোর্টালের মাধ্যমে বিষয় ও শ্রেণিভিত্তিক বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের জন্য রেখেছে, আফগানিস্তানে টেলিভিশন ও ইউটিউবে শিক্ষা চ্যানেলের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে (অ্যাপেনডিক্স-১) (সূত্র: https://en.unesco.org/covid19/educationresponse/nationalresponse)।

আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশের এই সকল চেষ্টা হয়ত সকল শিক্ষার্থীর নিকট পৌঁছচ্ছে না ঠিকই। কিন্তু এর সুফল কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ের জন্য ইতিবাচক দিক বয়ে নিয়ে আসবে। তার কারণ হলো বর্তমান সময়ে বিশ্বে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব চলমান। এই সময়ের শিক্ষাকে বলা হচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের শিক্ষা যা এখনকার সময়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রত্যাশিত। আইসিটির ব্যবহারে অভ্যস্ত এই প্রজন্ম চায় যেন তার শিক্ষার মাধ্যম হোক আইসিটি ভিত্তিক। তাই আমাদের শিক্ষকেরা যার যা আছে তাই নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস তৈরি করছেন এবং তা ফেসবুক অনলাইন ক্লাসে লাইভ অথবা ধারণকৃতভাবে সম্প্রচার করছেন। শিক্ষকদের এই চেষ্টা আমাদের মাঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ এর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের একটি অংশ জাগরিত করে তোলে '... সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না'।

অনেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে অনলাইন স্কুল চালু হওয়াতে সমালোচনা করছেন বা ভিন্ন মত প্রকাশ করছেন। এমনকি অনেকে গবেষণা করে বের করার চেষ্টা করছেন শতকরা কতজন শিক্ষার্থীর নিকট অনলাইন ক্লাস পৌঁছচ্ছে। পূর্বেই আমি উল্লেখ করেছি যে আমাদের দেশে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই এই সব মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষা গ্রহণ করতে সামর্থ্য না। কিন্তু এই চেষ্টাগুলোকে আমরা সমালোচনা করে থামিয়ে দিতে পারি না। অনলাইন শিক্ষা হলো নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ কাউকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া নয়। সুতরাং যার যতটুকু দরকার, যখন দরকার, যেভাবে দরকার তাই গ্রহণ করবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ক্লাসগুলো চলছে তা সংরক্ষণ করা থাকছে, সুতরাং শিক্ষার্থী ইচ্ছে করলে তার সুযোগ মতো পরেও দেখে নিতে পারবে। আর তাছাড়া শিক্ষার্থীর যে শিক্ষকের ক্লাস ভাল লাগবে শুধু সেটিই সে দেখতে পারবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী চাইলেই খুব সহজেই দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের দক্ষ শিক্ষকের ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে। কিছুদিনের মধ্যে এমন সুযোগও হয়ত একজন শিক্ষার্থী পাবে যে পছন্দের শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ টপিকের ক্লাস ফিল্টার করে দেখে নিবে।

অনলাইন ক্লাস তৈরি করতে যে দক্ষতাগুলো দরকার সেই দক্ষতাগুলোও আমাদের শিক্ষকরা আয়ত্ত করতে পারছেন। একুশ শতকের শিক্ষকের দক্ষতাগুলোর মধ্যে একটি হলো অনলাইন শিক্ষার জন্য ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা ও তা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে পৌঁছে দেয়া। শিক্ষক বাতায়নের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত দক্ষ কোন শিক্ষকের ক্লাস দেখতে পাচ্ছেন। ফলে এখানে দক্ষতার বিনিময় ঘটছে। সেই দক্ষতাগুলোও আমাদের শিক্ষকগণ খুব সুন্দরভাবে রপ্ত করে সৃজনশীলতা বিকাশ করছেন। আর সৃজনশীল শিক্ষকই তো পারেন সৃজনশীল শিক্ষার্থী তৈরি করতে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কোচিং ও গাইড বইয়ের উপর নির্ভরশীলতা কমে আসা। দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের সেরা শিক্ষকদের বিষয় ও শ্রেণিভিত্তিক ক্লাস যেখানে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে সেখানে কোচিং ও গাইড বইয়ের প্রয়োজন তো শিক্ষার্থীর নিকট কমে যাবেই।

এখনকার সময়ে শিক্ষার্থীদের পছন্দ পরিবর্তন হয়েছে... তারা চায় নিজেদের মতো করে শিখবে, কেউ তাদের উপর জোর করে শিক্ষা চাপিয়ে দিবে না। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করে শিখে নিতে পারছে। বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে অত্যন্ত সক্রিয় ভাবে কোন বিষয় শিখে নিচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ বিশ্ব নাগরিকদের এই পথ চলায় আমরা জ্ঞানকে চাপিয়ে না দিয়ে উন্মুক্ত রাখি। অনলাইন স্কুলগুলোতে যে শিক্ষকেরা ক্লাস নিচ্ছেন তারা সকলেই স্বপ্রনোদিত ভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালবাসা থেকেই ক্লাসগুলো নিচ্ছেন। আর একেকটি ক্লাস নেয়ার জন্য এই শিক্ষকেরা প্রস্তুতি নিয়ে মেধা, শ্রম ও নিজেদের অর্থ খরচ করে ক্লাসগুলো তৈরি করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন। তাই আসুন আমাদের চিন্তা চেতনায় প্রসারতা আনি এবং বৈশ্বিক মহামারির এই সময়ে শিক্ষকদের ত্যাগকে আমরা সম্মান জানাই।

মির্জা মোহাম্মদ দিদারুল আনাম

লেখক: প্রভাষক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা

ইত্তেফাক/আরএ