বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চুকনগরের মাতম

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:২৫

পাকিস্তানি মিলিটারি কর্তৃক ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের একটি হলো চুকনগরের গণহত্যা। এই গণহত্যার জ্বলন্ত সাক্ষ্য বহন করছে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি। ভারতের তৎকালীন নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর সরকারের সিদ্ধান্তে ভারত সরকার বর্ডার খুলে দেয় এবং লাখো শরণার্থীকে আশ্রয় এবং তাদের নিরাপত্তা দান করে।

দেশজুড়ে যখন পাকবাহিনী নির্মম হত্যাকাণ্ড শুরু করে তখন জীবন বাঁচাতে ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্যে খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ফুলতলা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, দৌলতপুর এবং বাগেরহাটের মংলা, রামপালসহ আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেয় ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকায়।

চুকনগর যেহেতু ছিল যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরার সংযোগস্থল, সে কারণে খুব সহজেই ভারত পাড়ি দিতে এই স্থানটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। লাখ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষের উদ্দেশ্য ছিলো খুলনার চুকনগর হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছানো। ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকা করে ভারত সীমান্তের উদ্দেশ্যে আসা মানুষের একমাত্র বিশ্রামস্থলও ছিলো চুকনগর বাজার। কারণ, তিনদিকে নদী ঘেরা চুকনগর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পার হলেই ছিল ভারতের সীমানা। তাছাড়া এখানে হানাদার বাহিনীর আনাগোনা ছিলনা বললেই চলে।

পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ভারত গমনেচ্ছু ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করে এবং সেই সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষে পৌছে যায়। পাকিস্তানি মিলিটারিরা এই খবর পেয়ে যায় স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে। ২০ মে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষেরা অপেক্ষা করছিলো ভারতে পাড়ি দেওয়ার জন্য। তখন কেউবা নিজের জীবন বাঁচাতে, আবার কেউবা যাচ্ছে স্বদেশ ভূমিকে দখলদারদের থেকে রক্ষা করার ট্রেনিং নিতে।

ঘড়ির কাঁটায় বেলা তখন ঠিক সাড়ে ১১টা। সেসময়ে সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১টি ট্রাক ও ১টি জিপ চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়ক ধরে আচমকা মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে। এর পরেই রাজাকার, আলবদর ও বিহারিদের সহায়তায় শুরু হয় নিদারুণ এক হত্যাযজ্ঞ। ভদ্রা নদীর পানি রক্তের বহরে লাল হয়ে যায়। তখন চুকনগর হয়ে ওঠে এক মাতমের স্থান। হাজারো মানুষের আর্তনাদ আর লাশের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল সেই অঞ্চলের বাতাস। বর্বর এই গণহত্যার শিকার হয় প্রায় দশ হাজারের অধিক বাঙালি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চুকনগরের নৃশংস গণহত্যা এক কালো অধ্যায় রচনা করেছে।। এটি বিশ্বের কোনো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এ স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে যা এখনও পর্যন্ত রয়েছে অরক্ষিত ও অবহেলায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের গণহত্যার ধারক এই নিদর্শনটি রক্ষার্থে সরকার এবং সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। এই নৃশংস গণহত্যা সম্পর্কে প্রজন্মকে জানানোর জন্য একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: শেখ শাহরিয়ার হোসেন, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন