বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত রোজিনা একজন উদ্যোক্তা

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:২৫

রোজিনার বয়স ২৫ বছর। সে একজন নারী উদ্যোক্তা। হাঁস-মুরগি পালন করে সে এখন আয় করছে। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে রোজিনা পুরস্কৃতও হয়েছেন। তার লালন-পালন করা হাঁস-মুরগি পরিবারের আমিষের চাহিদা মিটিয়ে বাজারেও বিক্রি হচ্ছে। যা তার আর তার পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখছে। তাই খুশি রোজিনার পরিবার।

কিন্তু এই অবস্থানে আসতে রোজিনাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। একজন সাধারণ মানুষ যতটা পরিশ্রম করে তার দ্বিগুণ বেশি পরিশ্রম করেছে রোজিনা—কারণ তিনি একজন ডাউন- সিনড্রোম বা ডিএস আক্রান্ত ব্যক্তি। তাকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছে ডিজএবল রিহ্যাবিলিটিশন অ্যান্ড রিসার্স অ্যাসোসিয়েশন বা ডিআরআরএ।

২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছর ২০০ জন ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে ‘লেটস অল ইউনাউটেড ইন গ্রুপ উইথ হোপ’ বা লাফ প্রজেক্টের মাধ্যমে। প্রজেক্ট ম্যানেজার তামজিদুল ইসলাম জানান, তাদের কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন ৭৪ জন নারী ও ১২৬ জন পুরুষ। ডাউন সিনড্রোম বা ডিএস আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব। তারা তাদের এই প্রজেক্টের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, রংপুর ডিভিশনে সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ—সাতটি স্থানে কাজ করে ডাউন সিনড্রোম বা ডিএস আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নে সক্ষম হয়েছেন। সমাজে যেন তারা মর্যাদাপূর্ণ জীবন পায় সে লক্ষ্যে কাজ করতে নেমে তার অনেকটাই সফল। তাদের সঙ্গে ছিল স্থানীয় ২০টি সহযোগী সংস্থা। আর তাদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় সাহায্য করে ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিসর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)।

কী এই ডাউন সিনড্রোম, কেন হয় ডাউন সিনড্রোম: ডাউন সিনড্রোম একটি জিনগত সমস্যা যার ফলে আক্রান্ত সব শিশুর চেহারা একই রকম হয়। ডাউন শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যেমন—মাংসপেশির শিথিলতা, চোখের কোনা ওপরের দিকে উঠানো, চ্যাপ্টা নাক, ছোট কান, হাতের তালুতে একটিমাত্র রেখা ও জিহ্বা বের হয়ে থাকা। স্বল্প মনোযোগী, স্বল্প বিশ্লেষণ ক্ষমতা, প্রবল আবেগপ্রবণ, জ্ঞান অর্জনে ধীরগতি, দেরিতে কথা বলা প্রভৃতি লক্ষ্মণ দেখা যায়।

এ সময় ডিআরআরএ দুটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপমতে ডিএস-এর জন্য প্রসবপূর্ব যত্ন স্ক্রিনিং রুটিন একটি উল্লেখযোগ্য। গবেষকরা দেখেছেন, গর্ভবতী নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি বা তার সমান হলে ডাউন সিনড্রোম শিশু হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, ডাউন সিনড্রোমের প্রায় ৮৫ শতাংশ থেকে ৮৮ শতাংশ মাতৃ ডিম্বাণুর ত্রুটির জন্য হয়, আর প্রায় ৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশ পৈতৃক শুক্রাণু ত্রুটির জন্য হয়। সমীক্ষা মতে ডাউন সিনড্রোম (ডিএস) আক্রান্ত ৮০ শতাংশ ব্যক্তি নিজেরাই স্নান করতে সক্ষম এবং তাদের মধ্যে ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে অন্যজনের সাহায্য নিতে হয়।

বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, মাত্র ১২ শতাংশ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত এবং আরো ৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক এবং বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রমে তালিকাভুক্ত ছিল। ৮ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে এবং ২৯ শতাংশ শুধু বিশেষ শিক্ষা গ্রহণ করেছে। ডিএসসহ ৪৭ শতাংশ ব্যক্তি শিক্ষাব্যবস্থার কোনো প্রকারে নথিভুক্ত ছিলেন না। গবেষণায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, খরচ, উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি এবং দূরত্বকে উত্তরদাতারা আনুষ্ঠানিক খাতে শিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাংলাদেশে হাসপাতালভিত্তিক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চিহ্নিত ক্রোমোসোমাল অসংগতিগুলোর মধ্যে ডাউন সিনড্রোম খুব সাধারণ। বাংলাদেশে ডাউন সিনড্রোমের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে, বাংলাদেশ সরকারের চলমান প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ সমীক্ষা মতে দেশে এ পর্যন্ত ৫ হাজারের অধিক ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের যুক্তি মতে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে দেশে ২ লাখ ২৫০ জন ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত। যেহেতু স্বতন্ত্র ধরনের প্রতিবন্ধীদের নির্দিষ্ট ডেটার অভাব আছে এবং তাদের ব্যক্তিগত চাহিদাগুলোও চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য যে আইন আছে তা কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সম্পদ বরাদ্দ সঠিকভাবে করা হয়নি।

বিজ্ঞজনেরা যা বলেন: অমর জ্যোতি বিশেষ স্কুলের প্রিন্সিপাল রাবেয়া ইয়াসমিন নীলা বলেন, ডাউন সিনড্রোম শিশুদের সফলতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর। বিষয়গুলো হলো কত অল্প সময়ের মধ্যে তারা শনাক্ত হলো, কত দ্রুত তাদের শিক্ষায় যুক্ত করা হয়েছে আর কারা তাদের শিক্ষা দিচ্ছে। অর্থাৎ বাবা- মা, পরিবার কিংবা প্রশিক্ষিত বিশেষ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে তারা দ্রুত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)-এর পরামর্শক ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়ক ডা. মাজহারুল মান্নান বলেন, স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যার মধ্যে ডাউন সিনড্রোম শিশুদের গুরুত্ব দিয়ে কিছু শেখালে তাদের দিয়ে সবই শেখানো সম্ভব। দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিএস নিয়ে কাজ করছে তাদের শিক্ষা ও সামাজিকীকরণ যদি গুরুত্ব পায় তবে তাদের সফলতার হার বেশি। আর তাদের ভকেশনাল শিক্ষার আগ্রহ ভালো। পাশাপাশি তারা শিল্পকলার ক্ষেত্রে বেশ ভালো সফলতা দেখায়। তাই, তাদের চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে আশা এখন উদ্যোক্তা

‘সবার মাঝে আইটি বিষয়ক জ্ঞান পৌঁছাতে চাই’

অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা করছেন ইমা

সোনালী আঁশের পথে মাশরাকার যাত্রা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পাপ্পুর 'মধ্যবিত্ত'

জিয়নের স্বপ্নে ঘেরা 'স্টেডফাস্ট'

তাসলিমা মিজি ও ‘গুটিপা’র গল্প