শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তরুণ সমাজে অপসংস্কৃতির প্রভাব ও করণীয়

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ১৭:১৩

জীবন ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক। সংস্কৃতি ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। কোনো ব্যক্তি, কোনো সমাজ কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতে পারে না। সংস্কৃতিই একটি জাতির পরিচয়। সংস্কৃতিই একটি জাতিসত্তার অস্তিত্বের কারণ। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের নৈমিত্তিক প্রচেষ্টা হলো সংস্কৃতি। অপরদিকে অপসংস্কৃতি হলো এর বিপরীত। অপসংস্কৃতি মানুষের জন্য অভিশাপ স্বরূপ। এটি মানুষের জীবনকে কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্যের বিকাশকে স্তব্ধ করে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। 

আজকের তরুণ সমাজই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি, আগামীর বিশ্ব তথা দেশ গড়ার কারিগর। তরুণ সমাজই পারে আগামী দিনের পৃথিবীকে আরো সুন্দরতর করে তুলতে। একটি দেশের সভ্যতা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কতদূর এগিয়ে যাবে, সেটা তাদের ওপরই নির্ভর করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে অপসংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মের সুন্দর ও স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের করাল গ্রাসে তরুণ সমাজ আজ নিমজ্জিত। এটা নিঃসন্দেহে তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরই প্রতিচ্ছবি। অপসংস্কৃতির ছোঁয়ায় দেশীয় সংস্কৃতি এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে অপছন্দনীয়। পোশাক-আশাকে, কথাবার্তায়, আচার-আচরণে পাশ্চাত্যের প্রভাব লক্ষণীয়। ফলে দিন দিন আমরা হাজার বছরের দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে হারাতে বসেছি।

মূলত বিদেশি কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ এবং দেশীয় সংস্কৃতি চর্চা না করার কারণে আজকে আমাদের এই দশা। এমন অনেক শিক্ষিত সমাজ রয়েছেন, যারা দেশীয় তথা নিজস্ব সংস্কৃতিকে লালন করা তো দূরের কথা উল্টো ঘৃণা করেন। একসময় খাদ্যাভ্যাস, ভাষা ও পোশাক-পরিচ্ছদে আমাদের নিজস্ব একটি ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ও চর্চার কারণে আমাদের সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে, জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির প্রবল প্রতাপ লক্ষণীয়। চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার এক উদ্ভট জোয়ার। দেশের তরুণ সমাজ আজ দিকভ্রান্ত, দিশেহারা। তাদের বেঁচে থাকার সঙ্গে নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত এই বোধ থেকেই অপসংস্কৃতির জন্ম হয়। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা এখন হাস্যকর ব্যাপার। দুর্নীতি যেন সামাজিকভাবে স্বীকৃত। আর অনৈতিকতার সূত্রপাত হচ্ছে মানুষের অসৎ জীবিকার্জনের হাত ধরে। সৎভাবে যে জীবিকার্জন করে না, তার পক্ষে অপসংস্কৃতির দাসত্ব করা ছাড়া উপায় নেই। প্রতিদিনের সংবাদপত্র আমাদের সামনে যে চালচিত্র তুলে ধরে, তাতে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন অতি স্পষ্ট। ধর্ষণ, অশ্লীলতা, ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নোংরামি, খুন, ছিনতাই, প্রতারণা— সবই অপসংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন নাম।

মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের জন্য এবং আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। সুস্থ ও শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই সব প্রকার অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা যায়। তাই সব প্রকার অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দেশীয় তথা নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি, বিদেশি অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য দেশীয় সংস্কৃতির জন্য এখন হুমকি স্বরূপ। এর উত্তরণ ঘটাতে হলে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে বর্তমান প্রজন্মদের ফিরিয়ে এনে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতিচর্চার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণ সমাজকে সাংস্কৃতিক চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতিকে লালন করতে হবে। বিদেশি সংস্কৃতির মোকাবিলায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় সংস্কৃতিকে আরো যুগোপযোগী করে তুলতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

প্রয়োজন সার্বিক সুস্থতা

কেন দরকার প্রমিত বাংলা?

অবহেলায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ওমিক্রন 

উদাসীনতায় সড়কে নক্ষত্রপতন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি : চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

করোনায় বেড়েছে ধনী-গরিবের বৈষম্য

ই-বর্জ্যের দূষণ রোধে পদক্ষেপ জরুরি