বৃক্ষ মানুষের পরম বন্ধু। বিপুল মানুষের পদভারে কম্পিত ও সুজলা সুফলা পৃথিবী প্রতিদিন বৃক্ষশূন্য হচ্ছে। অবাধ ও নির্বিচারে চলছে বৃক্ষ নিধন। ফলে প্রাণীর জীবন ধারণের জন্য নিয়ামক অক্সিজেনের সরবরাহ হ্রাস পাচ্ছে প্রবলভাবে। জীবিকার জন্য বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
সবুজ বৃক্ষ কেবল পরিবেশকে রক্ষা করে না, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের দেশে বৃক্ষ ও বনভূমির পরিমাণ নিতান্তই অপ্রতুল, যার জন্য সারা বিশ্বেই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। গ্রিন হাউজে আঘাত হানছে। পরিবেশ রক্ষা করা না হলে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্পের মতো মহাদুর্যোগে পড়তে হবে। সারা বিশ্বে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে জাতিসংঘের বিভিন্ন সম্মেলনে পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে বৃক্ষরোপণের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলাদেশের বনভূমি থাকা উচিত ২৫ শতাংশ, সেখানে বনভূমি রয়েছে ১৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বৃক্ষের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বলেছেন, ‘আমরা যেমন স্নান করি এবং শুভ্র বস্ত্র পরিধান করি, তেমনি বাড়ির চারপাশে যত্নপূর্বক একটি বাগান করে রাখা ভদ্র প্রথার একটি কর্তব্য অঙ্গ হওয়া উচিত।’
ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সামাজিক পর্যায়ে অধিকতর বৃক্ষরোপণ জোরদার করতে হবে। বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে হলে এটাকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এটাই সামাজিক বনায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রদত্ত সামাজিক বনায়নের সজ্ঞা হচ্ছে, ‘বনায়ন কার্যাক্রমে জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ততা করার যে কোনো পরিস্থিতিতে গোষ্ঠীভিত্তিক বনায়নে উত্সাহ ও সহায়তা প্রদানকল্পে বনশিল্প এবং সরকারি প্রচেষ্টায় পরিচালিত কর্মকাণ্ড সামাজিক বনায়নের অন্তভুর্ক্ত।’
বন বিভাগ ১৯৬০ দশকের শুরুর দিকে বন সম্প্রসারণ কর্যক্রমের মাধ্যমে প্রথম বনায়ন কর্মসূচি বনাঞ্চলের বাইরে জনগণের কাছে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প করেন মাহবুবুল আলম চাষী, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস (নোবেল বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা) এবং অধ্যাপক আলীমসহ বেশ কয়েক জন উদ্যোক্তা। তারা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বেতাগী ও পামোড়া নামের দুটি বিশাল পাহাড়ে এই প্রকল্প গ্রহণ করেন। এজন্য ভূমিহীন ১০১টি পরিবারকে বাছাই করে তাদের সেখানে জমি দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি ছিল স্বনির্ভর ধরনের। এসব কৃষক বাইরের কোনো অনুদান পাননি। গ্রামীণ ব্যাংক তখন প্রকল্পের আওতায়। সময়কাল ছিল ১৯৮১-১৯৮২ সাল। কৃষি ব্যাংকের অভ্যন্তরে বুথ খুলে গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ বিতরণ ও আদায় করত। এই বনায়ন কার্যক্রম দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে মূল্যায়নের সময় সন্তোষজনক ফল পাওয়া যায়। তবে নির্বাচিত ১০১টি পরিবারের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে ৮৩টিতে দাঁড়ায়। এই প্রকল্পলব্ধ অভিজ্ঞতা আরো কর্মসূচি প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যরা বর্তমানে মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শুধু ১৫ আগস্ট ২০২১—এই এক দিনে সারা বাংলাদেশে ১ কোটি গাছ লাগিয়েছে এবং মুজিববর্ষ থেকে এ পর্যন্ত গাছ লাগানো হয়েছে ৭ কোটি ২২ লাখ। ব্যক্তি পর্যায়ে গাছ লাগানোর বিষয়টি গ্রামে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
দেশের সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০০৪ কে আরো কার্যকর যুগোপযোগী করে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে। সামাজিক বনায়ন হলো স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে বনায়ন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। উপকারভোগীরা বনায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, বনজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, লাভ্যাংশ বণ্টন ও পুনর্বনায়ন—সব কাজেই এরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের অন্তভুর্ক্ত করা সামাজিক বনায়নের প্রধান লক্ষ্য। তাদের সামাজিক বনায়নের আওতায় এনে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, তাদের স্বনির্ভর হতে সহায়তা করা এবং তাদের খাদ্য, পশুখাদ্য, জ্বালানি, আসবাবপত্র ও মূলধনের চাহিদা পূরণ করা। নার্সারি সৃজন, প্রান্তিক ও পতিত ভূমিতে বৃক্ষ রোপণ করে বনজ সম্পদ সৃষ্টি, মরুময়তা রোধ, ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেহেতু উপকারভোগীরা স্থানীয়, তাই বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি অত্যন্ত যত্নসহকারে হয়ে থাকে। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমেই সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টি করা সহজ হবে।
সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী সামাজিক বনায়নে যারা উপকারভোগী হবেন—(ক) ভূমিহীন, (খ) ৫০ শতাংশের কম ভূমির মালিক, (গ) দুস্হ নারী, (ঘ) অনগ্রসর গোষ্ঠী, (ঙ) দরিদ্র আদিবাসী (চ) দরিদ্র ফরেস্ট ভিলেজের অধিবাসী এবং (ছ) অস্বচ্ছ মুক্তিযোদ্ধা। উল্লিখিত উপকারভোগীরা বন অধিদপ্তরের সঙ্গে সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে ২০ বছরের বা তার অধিক সময়ের জন্য চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারেন। যদি বনভূমিতে সামাজিক বনায়ন করা হয়, সেক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদান্তে গাছ বিক্রির টাকা বণ্টনের ধরন হবে—(ক) বন অধিদপ্তর পাবে ৪৫ শতাংশ, (খ) উপকারভোগীরা ৪৫ শতাংশ এবং (গ) বৃক্ষরোপণ তহবিল ১০ শতাংশ। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা দরকার।
লেখক :ব্যাংকার

