দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। তবে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকরা হাসপাতালে এসে রোগী দেখেন না। রোগী দেখেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এখানে আসা মুমূর্ষু রোগীরা পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত জরুরি সেবা। তাই রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায়ই সংঘাত হচ্ছে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিরাজ করছে নানা সংকট।
মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক অফিস আদেশের মাধ্যমে চিকিৎসকদের বিষয়টি অবহিত করেছেন। এরপরও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকরা কয়েক বছর ধরে বরিশাল নগরীতে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে তুলেছেন তাদের কোনোভাবেই হাসপাতালে পাওয়া যায় না। যারা অপেক্ষাকৃত কম সময় ধরে রয়েছেন অথবা নামডাক কম করেছেন তারা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে রোগীদের দেখার নামে বাইরে তাদের নামে-বেনামে গড়ে তোলা ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিকের প্রচার-প্রচারণা চালান। মেডিক্যালে ভর্তি থাকলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হতে পারে—এমন ভয় দেখিয়ে কিংবা এর চেয়ে ভালো চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিদিন এসব চিকিৎসকরা একেকজন গড়ে ২০ জন করে রোগী বাইরে তাদের তিন/চারটি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। রোগীরা বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের কথা মেনে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টাকার বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকরা তার অধীনে না থাকলেও মেডিক্যালে রুটিন করে রোগী দেখা তাদের দায়িত্ব এবং এ বিষয়টি তিনি বারবার তাদের জানিয়েছেন। পাঁচ মাস আগে সকাল ৯টায় এবং সন্ধ্যায় সুবিধামতো সময়ে সব অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের হাসপাতালে এসে নিয়মিত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ঐ চিঠির পর দুই-এক দিন কয়েক জন চিকিৎসক আসলেও পরবর্তী সময় আর এ নিয়ম কেউ মানছেন না।
তিনি বলেন, মুমূর্ষু রোগীদের সেবায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন। তাদের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সেবায় সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। আর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তো অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের কাছ থেকে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি শিখবেন। তাই চিকিৎসকরা হাসপাতালমুখী না হলে এ অবস্হা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানোর প্রসঙ্গে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান ইত্তেফাককে জানান, সবার আগে প্রয়োজন রোগীদের সঙ্গে আসা স্বজনদের চাপ কমানো। তা না হলে অরাজক পরিস্থিতি থেকেই যাবে। তবে যে সব চিকিৎসকরা হাসপাতালমুখী নন তাদের তালিকা করে তাগিদ দেওয়া হবে।
হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাকিন আহম্মেদ খান জানান, তাদের ব্যাচের ২০০ শিক্ষার্থীর সাত মাস হয়ে গেছে ইন্টার্নশিপের। আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি রয়েছে। তারা ঊর্ধ্বতনদের বারবার বলেছেন যে, চিকিৎসকরা যদি হাসপাতালে না আসেন তাহলে তারা হাতেকলমে শিখবেন কীভাবে। তারপরেও ইন্টার্নরা দিন-রাত সমানতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একেক জন রোগীর সঙ্গে স্বজন থাকে ২০ থেকে ২৫ জন করে। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। কিছু হলেই হুলস্হুল কাণ্ড শুরু করে দেন রোগীর স্বজনরা। আমরা চাই রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুই জন স্বজন থাকুক। পাশাপাশি হাসপাতালে আনসার সদস্য বৃদ্ধি করলে আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালকে পুঁজি করে চিকিৎসক থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত ডায়াগনস্টিকের রমরমা ব্যবসা করেন টাকা আয়ের জন্য। তারা সেখানেই ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসকদের সেবা না পেয়ে মারা যাওয়া কলেজছাত্র রিয়াদের মামাসহ দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হলে রাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় তাদের দুই জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) লোকমান হোসেন জানান, শনিবার রাতে হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে গ্রেফতার দুই জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা কয়েক জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় কলেজছাত্রের মামা আনোয়ার হোসেন ও শাওনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, গতকাল রবিবার সকালে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া রিয়াদের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
গ্রেফতার হওয়া শাওনের মা শাহনাজ পারভীন বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মৃত রিয়াদের স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের হকিস্টিকসহ লাঠি দিয়ে মারধর করেছে। আবার উলটো তারাই মামলা দিয়েছে। আমরা ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করব না। আমার নির্দোষ সন্তানের মুক্তি চা।
