রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব কি ভুল হতে চলেছে?

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২২, ০৪:০১

ব্যাংক ঋণের সুদ ও নীতি সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারণা কি ভুল প্রমাণিত হতে চলেছে? করোনার বিপর্যয় এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি এখন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক রেট ও নীতি সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু তার পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সাধারণভাবে মনে করা হয়, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ও নীতি সুদের হার বাড়ালে ঋণগ্রহণ তুলনামূলক ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মুদ্রাবাজারে মানি সাপ্লাই কমে যায় এবং একপর্যায়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করেছেন, সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে ধারণা এতদিন বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ছিল, তা ইতিমধ্যে ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। নীতি সুদের হার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সামান্যতম সাফল্য অর্জিত হচ্ছে না, বরং এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতির প্রচলিত ধারণা মোতাবেক, কোনো দেশ বা অঞ্চলে যখন মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক উচ্চতায় চলে যায়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সহজ পম্হা থাকে ব্যাংক রেট ও নীতি সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া। ব্যাংক রেট ও নীতি সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া হলে ঋণগ্রহণ অধিকতর ব্যয়বহুল হয়ে যায়। সেই অবস্থায় একজন উদ্যোক্তা চাইলেই ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন না। এতে বাজারে মানি সাকু‌র্লেশন স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পায়। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন মনে করে দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, তখন তারা বাজারে সরবরাহকৃত অর্থ থেকে কিছু মুদ্রা তুলে নেয়। আবার যখন বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর দরকার হয়, তখন কিছু মুদ্রা বাজারে ছেড়ে দেয়। অবশ্য ব্যাংক রেট ও নীতি সুদের হার কমানোর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও অর্থনীতির ওপর পড়ে। এতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে বেকার সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে।

করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হলে প্রতিটি দেশেই উন্নয়ন কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু একই সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্হিতি সম্পূর্ণ পালটে যায়। প্রতিটি দেশেই করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনর্বাসন কার্যক্রম স্হবির হয়ে পড়ে। সবচেয়ে সমস্যা দেখা দেয় মূল্যস্ফীতির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহত্ অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম নীতি সুদের হার বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা এ পর্যন্ত কয়েক দফায় নীতি সুদের হার ১ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক গত কিছুদিন ধরে প্রায় প্রতি মাসেই নীতি সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এ বছরের মধ্যেই নীতি সুদের হার অন্তত ৩ থেকে ৪ শতাংশ বাড়াতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয় ইতিমধ্যে অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। মার্কিন অর্থনীতির ৭০ শতাংশই আসে ভোক্তা ব্যয়ের মাধ্যমে। তাই ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার অর্থই হলো দেশটির অর্থনীতিতে চরম মন্দা সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে। গত ২৯ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক একবারে নীতি সুদের হার শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। মার্কিন অর্থনীতি দ্বিতীয় প্রান্তিকেও প্রথম প্রান্তিকের মতো সংকুচিত হয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই ভয়াবহ মন্দার করলে পড়তে যাচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেছিলেন, এই পদক্ষেপের ফলে তাদের দেশে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ভবিষ্যতে এই প্রত্যাশা পূরণ হবে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। গত ৪০ বছরের মধ্যে এটা দেশটির সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। ১৯৮২ সালের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা এত স্ফীত মূল্যস্ফীতি আর কখনোই প্রত্যক্ষ করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নীতি সুদের হার বাড়ানোর ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি কমেনি। কিন্তু এতে তাদের অন্যভাবে লাভ হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যে বিনিয়োগ রয়েছে, তা তারা প্রত্যাহার করে অধিক মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বার্থপর আচরণ বিশ্বের উন্নয়নশীল ও বিকাশমান অর্থনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনছে। এসব দেশের ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। প্রতিটি দেশই উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করে চলেছে। শুধু তাই নয়, তারা পরিস্হিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় বিশ্ব এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কিছুদিন আগে নীতি সুদের হার দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়িয়েছে। বর্তমানে নীতি সুদের হার হচ্ছে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু তার পরও মূল্যস্ফীতি কমছে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু কেউই এটা মনে করেন না যে, মূল্যস্ফীতি এতটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাবে। বরং কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলছেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার যদি ডাবল ডিজিট অতিক্রম করে না যায়, সেটাই হবে বড় অর্জন।

বাংলাদেশ মোট চাহিদাকৃত পণ্যের ২৩ শতাংশ বাইরে থেকে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। আর ৭৭ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে গতিশীল রাখা গেলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ততটা প্রকট আকার ধারণ করার কথা নয়। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মূলে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব। বিশেষ করে এই যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেল, গ্যাস ইত্যাদির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির জন্য সাপ্লাই সাইড ইফেক্ট এবং ডিম্যান্ড সাইড ইফেক্ট দায়ী। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তার পেছনে উৎপাদনজনিত ঘাটতি যত না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে সরবরাহজনিত সমস্যা। বিশ্ববাজারে চাল ও গমের সংকট চলছে। এই সংকট উৎপাদনজনিত নয়, এটা সরবরাহজনিত। রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলিতভাবে বিশ্ব খাদ্যচাহিদার ৩০ শতাংশ জোগান দেয়। এ বছর ইউক্রেনে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে ৮ কোটি টন। যুদ্ধের কারণে অন্তত ৩০ শতাংশ খাদ্যপণ্য মাঠেই থেকে যাবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের বন্দরে ২ কোটি টন খাদ্য নিয়ে জাহাজগুলো নোঙর করে আছে। রাশিয়ার আপত্তি ও হুমকির কারণে এই পণ্য রপ্তানি করা যাচ্ছে না। যদিও গতকাল থেকে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করার কথা। মূল্যস্ফীতির চূড়ান্ত অভিঘাত ভোক্তার ওপরই বর্তায়। আমাদের মতো দেশে বিষয়টি আরো একটু জটিল। উৎপাদক শ্রেণি যেহেতু সংগঠিত নয়, তাই মধ্যস্বত্বভোগীরা তুলনামূলক কম দামে তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে বেশি দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে। তাই যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত সমস্যা সমাধানের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

অবশ্য বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অন্ধকারের মাঝেও আলোর ঝলকানি প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ যদি আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধ করতে পারে, তাহলে আর্থিক মন্দা কিছুটা হলেও প্রতিহত করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। সেই অবস্থায় তারা তুলনামূলক কম দামের পণ্য কিনতে আগ্রহী বা বাধ্য হবেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য মূলত তৈরি পোশাককেন্দ্রিক। বাংলাদেশ সাধারণ তুলনামূলক কম মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের ভোক্তারা বাংলাদেশি কম দামের পণ্য কেনায় ঝুঁকে পড়তে পারে। সেই অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। প্রথম বারের মতো বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য থেকে উপার্জিত আয়ের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যদিও আমদানি ব্যয়ও রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ৭৭ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ২৩ শতাংশ পণ্য আমদানি করতে হয়। আমদানির ক্ষেত্রে কিছুটা কৃচ্ছ সাধন করা গেলে রপ্তানি আয় আমদানি ব্যয়কে অতিক্রম করে যেতে পারে। বাংলাদেশ যদি সঠিকভাবে আর্থিক ব্যবস্থাপনা করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের ক্ষতি হবে তুলনামূলকভাবে কম। এখন আমাদের ব্যয় সংকোচনের প্রতি বিশেষ জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন উৎপাদন সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শঠতার অভিযোগ বিশ্বকে জানানো হোক

আছে খরার আঘাতও

আইনের শাসন বজায় রাখতেই হবে

মুজিব দর্শন ভক্তি প্রজ্ঞা ও যুক্তির মেলবন্ধন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে কবে? 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বোঝা নয় 

পারিবারিক সংকটে বিপদে পড়ছে শিশুরা 

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’