শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পশ্চিমা ঐক্যে চিড় পুতিনের কাজকে সহজ করে দিচ্ছে

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:৫৫

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তা সম্ভবত এসে গেছে! সত্যিই যদি তাই হয়, তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে কাবু করতে তার আর খুব বেশি কিছু করার দরকার পড়বে না। এমনকি চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে তিনি চূড়ান্ত বিজয়ের দেখা পেয়ে গেলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

ইউক্রেনে শীত মৌসুম যত ঘনিয়ে আসছে, পুতিনের ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দিয়ে উঠছে খুশির ঝলক। তুষার জমাট বাঁধার সঙ্গে সঙ্গে ঝিমিয়ে পড়া ফ্রন্টগুলো (যুদ্ধক্ষেত্র) উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করবে। ইতিমধ্যে শুরু করেছেও। এই সময়ে কিয়েভের মনোবলে বেশ খানিকটা চিড় ধরবে। গতবারের শীতকালীন দৃশ্যপট বিবেচনায় এই দাবির যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে। এই বাস্তবতা যেহেতু ইউক্রেনের অজানা নয়, কাজেই ভেতরে ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক পেয়ে বসবে ইউক্রেন সেনাদের। পুতিন ঠিক এই মহাসুযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনে এসেছেন এতদিন।

অনেকে যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, রাশিয়া আর এই যুদ্ধে হারছে না। ইউক্রেনের যেসব অঞ্চল দখলে নিয়েছিল মস্কো, তা-ও বেহাত হওয়ার আশঙ্কা কম। অন্যভাবে বলতে গেলে, ইউক্রেনের বিজয় লাভের সম্ভাবনা কম নিশ্চিতভাবেই। যারা এ ধরনের কথা বলছেন, তাদের যুক্তি হলো—ইউরোপের দেশে দেশে নির্বাচনের মৌসুম চলছে, এমনকি অটল মিত্র পোল্যান্ডের কৃষকরাও তাদের ইউক্রেনীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন সন্নিকটে। এসব কিছুকে ছাপিয়ে ইউক্রেনের জন্য বড় দুঃসংবাদ হলো, মার্কিন-সীমান্ত ও অভিবাসননীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে এক ধরনের লড়াই চলছে রিপাবলিকানদের। এই পটভূমিতে গত বুধবার সন্ধ্যায় মার্কিন সিনেটে নেমে আসে বড় ধরনের স্থবিরতা। আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে ইউক্রেনের জন্য ৬০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্যাকেজ আটকে গেছে দুই দলের মতবিরোধে। অচলাবস্থার অবসানে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ‘হীন পক্ষপাতমূলক রাজনীতি’ করে কিয়েভের সাহায্যে বাগড়া না দেওয়ার জন্য কংগ্রেসের কাছে আবেদন জানান তিনি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘ইতিহাস তাদের কঠোরভাবে বিচার করবে, যারা স্বাধীনতা লাভে সাহায্যের রাস্তা অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করবে, এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে’। সব শেষে তিনি এ-ও বলেন, ‘আমরা পুতিনকে জিততে দিতে পারি না।’ তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এসব কথায় কাজ হবে না!

ইউক্রেনকে সহায়তার প্রশ্নে চলমান ঝামেলা মেটাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের সঙ্গে সম্ভবত খোলামেলা কথা হয়েছে ব্রিটেনের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রসচিব ডেভিড ক্যামেরনের। যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে—এমন বার্তা ওয়াশিংটনকে দেওয়া হবে, সেটাই স্বাভাবিক। এর কারণ, রাশিয়াকে ঠেকাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে আসছে লন্ডনও।

সন্দেহ নেই, বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে ইউরোপকে বেশ এককাট্টা থাকতে দেখা গেছে। একই উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় নিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে। ঐক্যে অটল থেকে চূড়ান্ত ফলাফল অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠতে দেখা গেছে। আবার এ নিয়ে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য দেখা যাচ্ছে সরকারগুলোর মধ্যে, তা-ও চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে, ইউরোপের সুরক্ষার প্রশ্নে, তথা ইউক্রেনকে সাহায্য করা-না করার বিষয়ে ওয়াশিংটনকে অনিশ্চয়তার মধ্য পড়ে যেতে দেখাটা যারপরনাই বিস্ময়কর।

লক্ষণীয় বিষয়, উদ্বিগ্ন রিপাবলিকানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো সংঘাতে (হোক তা ঘরে বা বাইরে) জড়িয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই নাকি সাহায্য প্রদান অবিলম্বে বন্ধ করার কথা ভাবছে। এক্ষেত্রে পালটা যুক্তি আছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। তাদের বক্তব্য, এই সাহায্যের উদ্দেশ্য হলো, প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শক্তি জোগানো, যাতে করে ইউক্রেন মস্কোর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। পুতিন যেন ন্যাটোর সীমানার কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতেই কিয়েভকে এই অর্থ প্রদান করা উচিত। অন্যথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্রদের সুরক্ষার জন্য মাঠে নেমে লড়াই করার বিকল্প থাকবে না। প্রক্সির মাধ্যমে কাজ থামিয়ে দিলে তাতে বরং বিপদ বাড়বে বই কমবে না।

এই যে পারস্পরিক দোষারোপের খেলা—হোক তা ছোট বা বড়, ইউক্রেনের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে সময় নেবে না। কারণ, পুতিন এর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন অধীর আগ্রহ নিয়ে।

বেনামি মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট এক লেখায় ব্যাখ্যা করেছে, কিয়েভের জন্য বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে হয়তো ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের এমনও দেখতে হতে পারে, মিত্ররা জটিল সামরিক হামলা বন্ধ করার কথা বলছে। বিমান আক্রমণের চিন্তা থেকে সরে আসছে। সত্যি সত্যিই যদি এরকম বিষয় ঘটে, তবে ন্যাটো সেনাদের নামিয়েও যুদ্ধে জয়ের দেখা পাওয়া যাবে না। পর্যাপ্ত তহবিল, যুদ্ধসরঞ্জাম ছাড়া যে কোনো বাহিনীই পড়ে পড়ে মার খাবে—এটাই স্বাভাবিক।

ইউক্রেনকে সাহায্য করার বিষয়ে যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে, দীর্ঘকাল ধরে এটাই কামনা করে আসছেন পুতিন। পুতিন যে কতটা কর্তৃত্ববাদী নেতা, এটা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। কী অসাধারণ পরিবর্তন ঘটেছে পুতিনের! কতটা ঠান্ডা মাথায় এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি! মাত্র ছয় মাস আগেও কী এক বাজে অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি! সেই অবস্থা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে যুদ্ধের মাঠে আবারও লাইমলাইটে—পুতিনের প্রশংসা না করলেই নয়।

রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা সরবরাহকারী গোষ্ঠী ওয়াগনার বাহিনীর প্রধান প্রিগোজিনের সঙ্গে বিবাদকে কি ছোট করে দেখার সুযোগ আছে? পুতিনের বিরুদ্ধে প্রিগোজিনের বিদ্রোহ ছিল অতি অল্প সময়ের, কিন্তু এর তাত্পর্য কতটা ব্যাপক, তা কি অস্বীকার করা যাবে? রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় শীর্ষ ওয়াগনার কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন প্রিগোজিন, অথচ এ নিয়ে টু শব্দটি হয়নি—বিষয়টা কি খুব সহজ?

মনে রাখতে হবে, তেলের অর্থে মস্কো সমৃদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে আটকানোর যে চেষ্টা চলেছিল, তা কাজে দেয়নি; অর্থাত্, সেনাপরিখাগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধসরঞ্জামাদির সরবরাহে আদৌ বেগ পেতে হবে না মস্কোকে। রাশিয়ান সামরিক বাহিনী পায়ের নিচে শক্ত মাটি পাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের পালটা আক্রমণকে বেশ ভালোমতোই আটকে দিচ্ছে রুশ সেনারা। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ন্যাটো-প্রশিক্ষণ বা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তাহলে ইউক্রেনের কী কাজে এলো, তাই ভেবে দেখার বিষয়! ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের ওপর থেকে মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিলে কিয়েভের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বর্তমান বাস্তবতায় ফ্রন্টলাইনগুলোতে অনেকটা কৌশলী অবস্থানে রয়েছে ইউক্রেন, যদিও তা টিকিয়ে রাখা কঠিন হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আসন্ন শীতকালে রুশ সেনারা এগিয়ে যাবে ক্ষীপ্র গতিতে। সমগ্র ইউক্রেন জুড়ে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করবে। পুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, পশ্চিমাদের সঙ্গে ঠেলাপাড়ার কারণে কার্যকর কৌশল কাজে লাগাতে ব্যর্থ হতে পারে কিয়েভ।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পুতিন যদি এখন কিয়েভের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার আলোচনায় বসতে চান, ইউরোপ তাতে রাজি হয়ে যাবে! কিয়েভ বসতে রাজি না থাকলে তাকে বাধ্য পর্যন্ত করাবে। অবশ্য অনেক পশ্চিমা নেতা তা না-ও করতে পারেন। এইসব নেতা পুতিনকে কোনোমতেই বিশ্বাস করতে চান না। কারণ তারা ভালো করেই জানেন, সামরিক লক্ষ্য হাসিলে কৌশলের অংশ হিসেবে যে কোনো পথে হাঁটতে পারেন পুতিন। তবে শান্তিচুক্তির পথে হাঁটলেই লাভ হবে কিয়েভের। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি কোনোভাবে ক্ষমতায় চলে আসেন, তবে গোটা ইউরোপের নিরাপত্তা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা জানেন অনেকেই।

কথা প্রসঙ্গে ট্রাম্পকে একাধিকবার গর্বসহকারে বলতে শোনা গেছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেনের জন্য কার্যকর শান্তিচুক্তি করার ক্ষমতা রাখেন তিনি। ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসা-না আসা বড় কথা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, তহবিল সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্ভূত সংকট, তা ইউক্রেন সামলাবে কী করে? আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন ভুলে যাচ্ছে, পশ্চিমা নিরাপত্তার জন্য এটা অস্তিত্বের লড়াই, যা থেকে পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পুতিন জিততে পারুক বা না পারুক, এর জন্য যে কেবল বর্তমান প্রজন্মই নয়, পরবর্তী প্রজন্মকেও চড়া মূল্য চুকাতে হবে, তা কি সবাই ভুলে যাচ্ছে?

লেখক: একাধিকবার এমি অ্যাওয়ার্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক। সিএনএনের লন্ডন চিফ ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি করেসপনডেন্ট

সিএনএন থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন