বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

এখন প্রয়োজন সবার ঐক্য

মুখোমুখি অবস্থানে চলচ্চিত্রের ১৮ পরিবারের সংগঠন এবং চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি
এখন প্রয়োজন সবার ঐক্য
এখন প্রয়োজন সবার ঐক্য।

১৮ সংগঠনের এক দফা দাবী, শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদত্যাগ করতে হবে। সেই সঙ্গে শিল্পী সমিতির নির্বাচনের আগে যে ১৮৪ জনের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যদিকে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি আলোচনায় বসার আহবান জানিয়েছেন কিন্তু তার আগে ১৮ সংগঠন যে মিশা সওদাগর ও যায়েদ খানকে বয়কট করেছে, তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তারা একই সঙ্গে ৭ দিনের আল্টিমেটামও দিয়েছে। না হলে কর্মবিরতিতে যেতে পারেন শিল্পীরা।

এই যখন অবস্থা, তখন সমাধান হবে কী করে?

করোনার সঙ্গে সারা দুনিয়া যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন এমন সাংঘর্ষিক দৃশ্যপট কোন ভাবেই কাম্য নয়। লকডাউনের পর দেশে সব শিল্পের কাজকর্ম শুরু হলেও দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পতে কোন কাজ কর্ম শুরু হয়নি। সিনেমা হলগুলো খোলার ব্যাপারেও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। বেকার হয়ে ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন শত শত কলাকুশলী। এমন কি অনেক শিল্পীও এখন বাসা ভাড়া দিতে না পেরে আত্মীয় অথবা দেশের বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করছেন। তারা বলছেন, এখন কাজ কর্ম নেই, ঢাকায় বন্দি জীবন কাটাতে হয়, তার চাইতে আমরা গ্রাম-বাংলার খোলামেলা আবহাওয়ার মাঝে আছি। আসলে মান বাঁচাতেই তাঁরা এমনটি বলছেন।

দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প যখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, তখন চলচ্চিত্র নির্মাতারা কী বলছেন? আর টাকা যারা বিনিয়োগ করেন, তারাই বা কী ভাবছেন?

পরিচালকদের অনেকেই বলছেন, বিনিয়োগ না আসলে এই শিল্প আর বাঁচবে না। আর সিনেমা হল যদি না খোলে, তবে সিনেমা বানিয়েও লাভ হবে না। তাই আপাতত দৃশ্যে, আমাদের সিনেমা মৃত প্রায়।

অন্যদিকে প্রযোজক, যারা টাকা বিনিয়োগ করেন, তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁরা টাকা বিনিয়োগ করতে চাইছেন না।

প্রেক্ষাগৃহ মালিক সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, দেশে ১২০০ সিনেমা হল থেকে কমতে কমতে ১৬০টি সিনেমা হল চালু ছিল। করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে এখন আর প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা হল খোলার ব্যাপারে খুব আগ্রহী নন। কারণ, প্রথমত দর্শক টানতে পারে, এমন সিনেমা খুব একটা নেই। করোনার আগে চলতি বছরে যে সিনেমাগুলো মুক্তি পেয়েছিল, এগুলোর কোনটি থেকেই সিনেমা হলগুলো টাকা তুলতে পারেন নি। এর পরে দীর্ঘসময় বন্ধ। অনেক হলের প্রজেক্টর ঠিক আছে কী না, হলের পর্দা ঠিক আছে কী না, এগুলোও এখন দেখার সময় নেই। জানা গেল, সিনেমা হল খুললেও ১০০টি হল হয়তো বা আর খুলবে না। হয়তো ষাটটির মত হল খুলতে পারে। তারপর যদি দর্শক না আসে, তবে এগুলোও আর চালু রাখা সম্ভব হবে না।

দেশীয় সিনেমা শিল্পের যখন এই হলো বাস্তবচিত্র, তখন কী আমাদের সমিতির নেতাদের এই মুখোমুখি অবস্থানে যাওয়াটা শোভনীয়? একটি পর একটি ঘটনা ঘটছে, সেখানে মীমাংসা না করে আরো আগুনে যেন ঘি ঢেলে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন বিনোদন সাংবাদিকতা করার সুবাদে এতটুকু জোরগলায় বলতেই পারি, নেতারা উপরের সমস্যাগুলোকে পাশ কাটাতেই নিজেদের মধ্যে সমস্যা জিইয়ে রাখতে ব্যস্ত।

যদিও চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি ও পরিচালক সমিতির নেতৃত্বে বর্তমানে যারা আছেন, তাদের ওপর যথেষ্ট আস্থা রেখেছিলেন চলচ্চিত্র শিল্পের সকলেই। বিশেষ করে পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, এবং প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু তারা দুজনেই আর্থিক ভাবে বেশ সচ্ছল। তারা দুজনেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নানা ভাবেই যুক্ত রয়েছেন। সরকারের উচ্চ মহলেও রয়েছে তাদের যোগাযোগ। অনেকের মতই একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি বিশ্বাস করতে চাই, যে জনাব খোরশেদ আলম খসরু অতীতে যেমন তার প্রযোজনা সংস্থা থেকে একের পর এক ছবি বানিয়ে বেশ বড় অবদান রেখেছিলেন এবং অনেকগুলো ছবি ব্যবসা সফল হয়েছে, তাই আজকের দুর্দিনে, তিনি অন্তত ৫টি ছবি একাই করার ক্ষমতা রাখেন। তারা করাও উচিত। যেহেতু জনাব খসরু আপনি চলচ্চিত্রের সবচাইতে বড় সংগঠনের অভিভাবক, তাই আপনার দায়িত্ব এটি। আপনি ছবি নির্মাণ শুরু করলে, আপনার দেখাদেখি আরো ৫জন প্রযোজক এগিয়ে আসবেন।

মুশফিকুর রহমান গুলজার আপনি অনুদান পেয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। আপনাকে অভিনন্দন। আপনার পক্ষেও তো সম্ভব বছরে দু থেকে তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার। আপনি পরিচালক সমিতির সভাপতি, আপনাকেই এখন এগিয়ে আসতে হবে।

কিন্তু আপনারই যদি ছবি না বানানো শুরু করেন, তাহলে তো অন্যরা এগিয়ে আসবে না। আর আপনরা হলেন, সবচেয়ে বড় অভিভাবক, সেখানে মিশা ও যায়েদ খান এই সাহস পায় কোথা থেকে? আপনারা টাকা বিনিয়োগ করেন এবং ছবি নির্মাণ করেন, আপনারা যেভাবে বলবেন, শিল্পীরা সেভাবেই কাজ করবেন। এটাই নিয়ম। এখানে এত দলাদলির কিছু নেই। আপনারা কাদেরকে বয়কট করছেন? এদের বয়কট করলে কী চলচ্চিত্র শিল্প উপকৃত হবে?

এবারে আসি মিশা ও যায়েদ প্রসঙ্গে। মিশার অবশ্যই ব্যর্থতা হচ্ছে, তিনি তার সাধারণ সম্পাদককে অতি উৎসাহী হয়ে সব কিছুতে নাক গলানো থেকে বিরত রাখতে পারেন নি। মিশার কাছে সবার প্রত্যাশা বেশি এই কারণে যে, মিশা দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে আছেন, অসম্ভব জনপ্রিয় একজন শিল্পী। তিনি তো সাংগঠনিক ভাবে দক্ষ একজন মানুষ। তিনি তো ভাল করেই জানেন, প্রযোজক ও পরিচালক ছাড়া চলচ্চিত্র কেউ বানাতে পারবে না। তারা তো লক্ষী। তবে কেন, তাদের সঙ্গে রেষারেষির পর্যায়ে যেতে হবে। প্রযোজক টাকা বিনিয়োগ করেন, তাদের সঙ্গে যে কোন বিষয়ে আলোচনা করে নিলে কী সমস্যা? চলচ্চিত্র শিল্পের ব্যয় কমাতে ১ লাখ টাকার ওপর শিল্পীদের কনভেন্স যদি প্রযোজকরা বন্ধ করে দিয়ে থাকেন, তবে সেটাকে মেনে নিলে দোষ কোথায়? মিশা সওদাগর এই বাস্তবতা যদি না বোঝেন, তবে তা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আর একটি কথা, শিল্পী সমিতির নির্বাচন শেষেও আমরা দেখেছি শিল্পীদের মধ্যে দুই থেক তিনটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এখানে জনপ্রিয় শিল্পীরা উপেক্ষিত।

আপনি মিশা সওদাগর কেন জনপ্রিয় শিল্পীদের অভিমান ভাঙ্গালেন না। মৌসুমী, রিয়াজ-শাবনূর, ওমর সানী, অমিত হাসান, পূর্নিমা, পপি, নিপুন, তারা তো আপনার সমিতির-ই সদস্য। আপনিতো তাদেরই সভাপতি। তো তারা নির্বাচনে আপনাদের বিরোধিতা করতেই পারে, এখন তো নির্বাচন শেষ, তারপরেও কেন এই বিভাজন? তিন বছর আগে নির্বাচনের রাতে শাকিব খানকে এফডিসিতে লাঞ্চিত করা হলো, কই আপনি তো তাদের বিরুদ্ধে কোন রকম ব্যবস্থা নেন নি। আক্রমণকারীরা দেখি, এখনো দম্ভের সঙ্গে বলে, আমরা শাকিব খানকে মেরেছি। এরা আজ আপনাদের প্রশ্রয়ে আছে। সেদিন বেশিদিন দুরে যেদিন আপনাদের সঙ্গেও হয়তো এই অসভ্য দলটি এমন আচরণই করবে। আশা করি মিশা সওদার বাস্তবতা উপলব্ধি করে কার্যকরী ব্যবস্থা নেবেন। আপনি সকলের কাছে যাবেন, তাদের কষ্টের কথাগুলো শুনবেন, মান ভাঙ্গাবেন।

যায়েদ খান। তরুণ প্রাণ। অনেক পরিশ্রমী। নির্বাচিত হওয়ার পরে অনেকগুলো কাজকর্ম করেছেন। চেষ্টা করেছেন, শিল্পী সমিতিরি কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু যায়েদ মুদ্রার অপর পিঠে আমরা আপনার অন্য রূপও দেখি।

প্রথমত, আপনি অসম্ভব রকমের প্রতিশোধ পরায়ণ। আপনি শুরু থেকেই সমিতির মধ্যে দলাদলি কোন্দল জিইয়ে রেখেছেন। আপনার সঙ্গে এত মানুষের বিরোধ হয় কেন? একবার ভাবুন তো আপনার জন্য কতগুলো ইস্যু তৈরি হয়েছে এই শিল্পে। আপনি সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন, আনাকে আপনার সম্মান ধরে রাখতে জানতে হবে। পুলিশ প্রশাসনে আপনার ভাল যোগাযোগ , আপনি তা নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন, এই কথা এফডিসির বালুকণাও জানে ? কেন বলে এই কথাগুলো মানুষ, তা কী কখনো ভেবেছেন? যে সাংবাদিকদের সঙ্গে শাকিব খানের ভাল সম্পর্ক, আপনি শিল্পী সমিতিতে তাদের অলিখিত ভাবে কালো তালিকাভুক্ত করেন। কোথা থেকে এই স্পর্ধা পেলেন আপনি? আপনি কেন এফডিসিতে অনেক রাত অবধি আনাগোনা করেন এ নিয়েও খোদ এফডিসি প্রশাসনের প্রশ্ন রয়েছে।

আপনি নিজেকে সংযত করুন যায়েদ খান। এক সময় যারা আপনার পাশে ছিল, তারা কিন্তু সরে যাচ্ছেন। এই ১৮ সংগঠনের অনেক নেতাই কিন্তু আপনার নির্বাচনে আপনার জন্য কাজ করেছেন, আজ তারাও আপনার বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলছেন. তারমানে তো আপনি নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিত হচ্ছেন, একই সঙ্গে আপনি আপনার সভাপতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। আপনার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কেন এমন আলোচনা হচ্ছে? অতীতে শিল্পী সমিতির কোন সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে এই অভিযোগ আমি আমার ২৭ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে শুনিনি। এমনটি ভাল নয়। আজ সাধারণ মানুষ সব যখন জানছে, তখন কী আর আপনাদের সম্মান দেবে। সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের মানুষ তাদের স্বপ্নের মানুষ মনে করে। কিন্তু আপনাদের যে কর্মকাণ্ড তাতে করে আপনারা আর সেই সম্মানের জায়গাটি ধরে রাখতে পারছেন না। চলচ্চিত্র প্রযোজক-ও পরিচালকরা শিল্পী তৈরি করতে পারেন। তারা চাইলে, আপনাদের ছাড়াও কাজ করতে পারবেন। নতুন ছেলে মেয়েদের নিয়ে আসবেন। কিন্তু আপনারা প্রযোজক-পরিচালক ছাড়া কাজ করতে পারবেন না। তাই বিনীত অনুরোধ করবো যে, ক্ষমতার দম্ভ আর অহমিকা ছেড়ে বিনয়ী হউন। আপনি যে ভাল কাজগুলো করেছেন, সেগুলো কিন্তু আপনার বিতর্কিত আচরণের জন্য চাপা পড়ে যাচ্ছে। আপনিই আপনাকে ডোবাচ্ছেন। বোধকরি আপনি নিজের ভুল শুধরে নেবেন। শাকিব খান, রিয়াজ-ফেরদৌস, পপি, ওমর সানী, মৌসুমীকে সমিতিতে ফিরিয়ে আনুন। তাদের সম্মান দিন। আপনি সম্মানিত হবেন।

এখন প্রয়োজন সবার ঐক্য। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলচ্চিত্রের সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে যেতে হবে। আমরা জেনে আনন্দিত হয়েছি যে প্রযোজক-পরিচালক সহ অন্যান্য সংগঠন মিলে সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছেন। আপনারা এখন সরকারের কাছে যাবেন। সরকারকে বোঝাবেন, কেন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে? শিল্পকে বাঁচাতে প্রণোদনা দিতে হবে। এই শিল্প, এই এফডিসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। তার কন্যা শেখ হাসিনা আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি থাকতে এই শিল্প মরে যাবে, এটা হতে পারে না। তিনি এটা হতে দেবেন না।

চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রের জন্য সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা চেয়েছেন। প্রযোজক-পরিবেশক সমিতিকে ধন্যবাদ। কিন্তু এই ভাল উদ্যোগগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে, আপনাদের

নিজেদের গণ্ডগোলের কারণে। সময় অনেক নষ্ট হয়েছে। অতীতের ভুলগুলো মনে না রেখে সবাই এক হয়ে কাজ করুন, দেখবেন সিনেমার অন্ধকার কেটে যাবে। নতুন দিনের আলোর সূচনা হবে।

লেখক: অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান, নাগরিক টিভি

সাধারণ সম্পাদক , বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত