বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া ও ইহার সুফল

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৫
বর্তমান মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হইয়াছিল যে, তাহারা ক্ষমতাসীন হইলে প্রাইভেটাইজেশন বা বেসরকারিকরণের প্রতি জোর দিবেন। অথচ সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ হইতে চলিল। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তেমন কোন অগ্রগতি নাই। অর্থাত্ বেসরকারিকরণ নীতির ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন হয় নাই। অনেকে এই মর্মে অভিযোগ তুলিয়াছেন যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও করপোরেশনের চাপে খোদ প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানানো হইয়াছে। কমিশনের তালিকায় বেসরকারিকরণের জন্য ২৭টি সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম লিপিবদ্ধ ছিল। তন্মধ্যে এই সরকারের মেয়াদে মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় আনিতে পারিয়াছে কমিশন। ঝুলিয়া থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলি এই সরকারের আমলে আর বেসরকারি হইবে কিনা সেই ব্যাপারে নিশ্চিত করিয়া কিছু বলা যাইতেছে না। নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকিলেও কেন এই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইল সেই সম্পর্কে পর্যালোচনা করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। কেননা বত্সরের পর বত্সর রুগ্ন ও লোকসানি সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপারে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলে জনগণকেই বহন করিয়া যাইতে হইবে সেইসব প্রতিষ্ঠানের বোঝা। কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের সুবিধার জন্য সমগ্র জাতিকে এইভাবে আর্থিক ক্ষতি ও চাপের মুখে রাখা যায় না। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের এই যুগে সরকারের কর্মপরিধি যত ছোট হয় ততই সুবিধাজনক। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের আলোকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উপর ছাড়িয়া দেওয়াই আবশ্যক। এমনটি নয় যে, বাংলাদেশে বেসরকারিকরণের কোন সাফল্য কাহিনী নাই। প্রাইভেটাইজেশন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত উচ্চপর্যায়ের এক সমীক্ষা হইতে জানা যায়, ১৯৯৩ হইতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মোট ৭৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে ৪৪টি প্রতিষ্ঠান রুগ্নতার ধকল কাটাইয়া ক্রমান্বয়ে লাভজনক হইয়া উঠিয়াছে। এইসব প্রতিষ্ঠানে নূতন করিয়া আরও ২৯০ শতাংশ জনবল বাড়ানো হইয়াছে। আগে যেখানে জনবল ছিল ৩১ হাজার, বর্তমানে তাহা ৯০ হাজারে পরিণত হইয়াছে। ফলে কর্মসংস্থান বাড়িয়াছে। কেবল অপচয় রোধ, ব্যয় সংকোচন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে এইরূপ সাফল্য ধরা দিয়াছে। অবশিষ্ট ৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৬টি নূতন করিয়া চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন এবং ১৫টি প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি একেবারে অকেজো হওয়ায় বন্ধ আছে। আদমজী পাটকলের করুণ কাহিনীর কথা আমরা সকলেই জানি। লোকসানের ভারে জর্জরিত হইয়া রাষ্ট্রায়ত্ত এই পাটকলটি বন্ধ হইয়া যাইবার পর তাহার যন্ত্রাংশ নিয়া দেশের আনাচে-কানাচে বেসরকারি উদ্যোগে গড়িয়া ওঠে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারখানা। এই কারখানাগুলি কেবলমাত্র সুব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন সমৃদ্ধি লাভ করিতেছে। ফলে কারখানার পরিধি বাড়িতেছে এবং এইসব কারখানা হইতে উত্পাদিত পণ্য বিদেশেও রফতানি হইতেছে। এই দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে থাকিবার পরেও কেন বেসরকারিকরণে গড়িমসি তাহা বোধগম্য নহে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার অভাবকে অনেকে দায়ী করিতেছেন। তাহাছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত আইনি জটিলতা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও করপোরেশনের আপত্তি, নিষকণ্টক প্রতিষ্ঠানের তালিকা না পাঠানো, আইন অনুযায়ী স্বাধীন মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতিষ্ঠানের পরিসম্পদ ও দায়দেনা মূল্যায়নের পরও মূল্য বাড়াইয়া দেখার অনুরোধের কারণে পুনঃ পুনঃ দরপত্র আহ্বান, দরপত্র আহ্বানের পর বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করিলেও সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা ইত্যাদি কারণে বেসরকারিকরণে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হইতেছে। এমতাবস্থায় লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান দ্রুত বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের জন্য সমপ্রতি প্রাইভেটাইজেশন কমিশন চিঠি লিখিয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করিয়াছে। আমরা আশা করি, এই ব্যাপারে শীঘ্রই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে।