বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

নাগরিক মতামত

করোনা উত্তর প্রকাশনা শিল্প

করোনা উত্তর প্রকাশনা শিল্প
প্রকাশনা শিল্প

করোনা ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মী ছাটাই শুরু করেছে। প্রতিনিয়ত চাকরি হারাচ্ছে কর্মজীবী মানুষ। ইউরোপ আমেরিকার অনেক নামকরা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক কর্মসূচিতে ব্যাপক কাটছাঁট শুরু করেছে। ব্যবসা কমে যাওয়ায় এছাড়া তাদের অবশ্য উপায়ও নেই। ধারনা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই হতে যাচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কতটা মারাত্মক হবে তা এখনই আঁচ করা মুশকিল। তবে অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এই অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পৃথিবীর মানুষের অনেক সময় লাগবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোকে এই মন্দা কাটাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে এটা নিশ্চিত। বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ হিসাবে এরই মাঝে বাংলাদেশেও এর আঁচড় পড়েছে। একমাত্র প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ছাড়া বাকি সবাই এর ভুক্তভোগী।

আমাদের এখানে ইতোমধ্যে গার্মেন্টস শিল্পে ব্যাপক হারে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়েছে। টিকে থাকার জন্য ঢাকায় বেশ কিছু প্রাইভেট স্কুলের ফার্নিচার বিক্রির খবর টিভি সংবাদে প্রচারিত হয়েছে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর মতো জনঘনিষ্ঠ ব্যবসা পুরোপুরি বসে গেছে। বাস, ট্রেন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। কবে এসব আগের মতো হবে, জানা নেই।

তবে আমার মনে হয় করোনায় সবচে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা ও তার সাথে জড়িত শিল্প। এমনিতেই প্রকাশনা শিল্প আমাদের দেশে আজও তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেনি। তার প্রমাণ স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছরেও সৃজনশীল পুস্তক বাজারজাত করার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্থায়ী মার্কেট গড়ে না ওঠা। তার উপর করোনার থাবা এটিকে আরো নড়বড়ে করে তুলেছে। অনেক সম্ভাবনা জাগিয়ে এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় একাধিক ‘বুক ক্যাফে’ শুরু হলো। কিন্তু করোনার আক্রমণের পর চোখের সামনেই দীপনপুর, কাবিতা ক্যাফে, নালন্দাসহ বেশকটি ক্যাফে বন্ধ হয়ে গেলো। যারা টিকে আছে তারাও ধুঁকছে। খেয়ে-’পরে বেঁচে থাকার চেষ্টাই যেখানে মুখ্য সেখানে সাহিত্যপাঠের মতো বাঙালী বাবুয়ানা এখন বেমানান।

সংক্রমণ থেকে বাঁচতে গৃহবন্দী সময়টায় মানুষ যথাসম্ভব অনলাইনে কাজ সারার চেষ্টা করছেন। বাসায় বসে ই-মেইল অথবা ফোনে অফিসের কাজ করাই এখন সবার জন্য নিরাপদ। ঠিক একারণেই অনলাইন বইও এখন সময়ের দাবী। অনলাইনে বইবিক্রির সাইটগুলোও আগের চেয়ে সক্রিয় ও শক্তিশালী হচ্ছে। এটাই যুগোপযোগী, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। কাজেই এর সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদেরকে সময়োপযোগী করে তুলতে হবে। অনেক প্রকাশকই তাদের প্রকাশিত বইয়ের অনলাইন ভার্সন করে নিচ্ছেন। হার্ড কপির পাশাপাশি সবাইকেই এটা করতে কবে। সাধারণত প্রকাশিত বইয়ের তথ্য রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডারে রাখার জন্য ছাপা বইয়ের হার্ড কপি আর্কাইভে জমা দিতে হয়। এর সাথে অনলাইনেও যাতে প্রতিটি প্রকাশিত বইয়ের তথ্য রাখা যায় তার জন্য আর্কাইভের সাইটকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে নিতে হবে। বইয়ের টেন্ডারগুলো অনলাইনে জমা দেয়ার সুযোগ থাকতে হবে। গণগ্রন্থাগার বা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ওয়েবসাইটটি সময়োপযোগী করে বানাতে হবে যাতে, প্রকাশকগণ নিজেদের প্রকাশিত বই ওখানে নির্দিষ্ট নিয়মনীতির আওতায় আপলোড করতে পারেন। আর তা থেকে পাঠকগণ ইচ্ছা মতো বই নির্দিষ্ট চার্জের বিনিময়ে ডাউনলোড করতে পারেন, তার সুযোগও থাকতে হবে।

প্রতিবছর গড়ে সাত থেকে আট হাজার হাজার সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশিত হচ্ছে। যদিও এসব বই বাজারজাত করণের জন্য স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছরেও দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বই বিক্রির বাজার গড়ে ওঠেনি। এটা থেকে বের হবার সঠিক সময় এখনই। বইয়ের বাজারকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোয় নিয়ে আসতে হবে, যেমনটা আমরা করেছি কম্পিউটার সহ অন্যসব নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ক্ষেত্রে। কথা হচ্ছে, সৃজনশীল পুস্তককে আমরা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তালিকায় রাখবো কিনা। যদি রাখি তাহলে এককথা, না রাখতে চাইলে এনিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই। আগেও বলেছি, আবারো বলছি, সৃজনশীল পুস্তক বাজারজাত করার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর, জয়কালি মন্দিরে ঢোকার বাঁদিকে থেকে টিএসসি পর্যন্ত অথবা ছবির হাট থেকে টিএসসি পর্যন্ত রাস্তাটিকে সিলেক্ট করা যেতে পারে। এরপর এই রাস্তায় লম্বা টানা একতলা মার্কেট নির্মাণ করে নির্দিষ্ট নিয়মনীতির আওতায় সৃজনশীল প্রকাশকদের বরাদ্দ দিন। বাকিটা প্রকাশকগণ নিজেরাই করে নিতে পারবেন। আমার মতে, সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচাতে এটি একটি সময়োপযোগী বিকল্প। তাছাড়া, আমি তো মনে করি দীর্ঘদিন এক জায়গায় থমকে থাকা প্রকাশনা শিল্পের জন্য করোনা বরং একটা আর্শিবাদ হয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন এখানে একটা বাজে সিন্ডিকেট ঘাপটি মেরে আছে। এই সুযোগে এই আপদও বিদায় হবে। দীর্ঘ চল্লিশ বছর যারা প্রকাশনা শিল্পকে চলমান রাখার জন্য শ্রম দিয়েছেন, অর্থ লগ্নি করেছেন, তাদের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা কেন এখনো ঘোষণা হয়নি, এটা বিরাট প্রশ্ন! এই বিষয়ে আমি সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

বিজ্ঞানীরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন টেকসই ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য। আশা করি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তুলনামূলক কম সময়েই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের ভ্যাকসিন পৃথিবীর মানুষের হাতে চলে আসবে। আবারো আমরা সবাই প্রাণ খুলে সবুজে হারাবো। হাসিমুখে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরবো। প্রিয়তম মানুষকে চুমো খাবো। বারান্দায় বসে চেয়ারে হেলান দিয়ে ধূমায়িত চায়ে চুমুক দিয়ে দৈনিক পত্রিকায় চোখ বুলবো। প্রিয় বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাবো। তার আগে যেন প্রকাশনার সাথে জড়িত মানুষগুলো তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখে বেঁচে থাকে, রাষ্ট্রের তরফ থেকে দ্রুত তার জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে, সেই সুন্দরের অপেক্ষা আছি।

লেখক: প্রকাশক, সাহস পাবলিকেশন্স

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত